নিখুঁত মানুষদের দেশে

What is your dream destination?

নিখুঁত মানুষদের দেশে

চোখে ঘুম নিয়ে ব্যাংকক সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের বোর্ডিং গেটের সামনে শরীরটাকে কোনমতে টেনে নিয়ে চোখ মেলে সামনে তাকাতেই শান্ত-সমাহিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যটাকে দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলাম। আমার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একটা এয়ারবাস ৩৮০ বিমান। কতগুলো ইউরোপিয়ান দেশের উদ্যোগে বানানো এই মডেলের বিমানটি পৃথিবী সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী বিমান। আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির বিমানকে পেছনে ফেলতে এই বিমানটি তারা বানিয়েছে। যেমন উঁচু, তেমনই বিশাল এর আকার, পাখাও মস্ত বড়! ডাবল ডেকের এই বিমান এতই বড় যে পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাণী নীল তিমিও এর পেটে ঢুকিয়ে ফেলা যাবে – একটা নয় – দুইটা! সবগুলো ইকোনমি ক্লাসের সিট বসালে এই প্লেনে আটশ জন যাত্রী এঁটে যাবে। সবার আগে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এই মডেলের প্লেনটি কেনে। সেই সময়ে, এই প্লেনের জন্য সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরের রানওয়ে চওড়া করতে হয়েছিল। প্লেনটি বানাতে এত বেশী কার্বন ফাইবার লেগেছিল যে এর ইনিশিয়াল প্রোডাকশনের সময় সারা পৃথিবীতে কার্বন ফাইবারের ঘাটতি পড়ে যায়। এই প্লেনে লাগানো বাইশটি চাকার দাম কত জানেন? ষোল কোটি টাকা! যেই প্লেনের চাকার দামই এত তার পুরোটার দাম কত হবে আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়ই!

এর আগে ঢাকা থেকে ব্যাংককের বিমান ছিল রাত দুইটায়। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক থাই এয়ারওয়েজের ব্যাগেজ ড্রপ আর বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করার লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যখন বোর্ডিং পাস হাতে পেলাম তখন প্লেন ছাড়ার সময় হাতে আছে আর মাত্র ত্রিশ মিনিট। বাসা থেকে রাতে খেয়ে বের হতে পারিনি। এইজন্য দৌড়াতে দৌড়াতে একটা লাউঞ্জে ঢুকে গপাগপ কিছু খাবার পেটে পুরেই আবার দৌড়ালাম। শেষ যাত্রী হিসেবে প্লেনের ভেতর ঢুকে একটু ঢুলুনি আসতে না আসতেই ব্যাংকক পৌঁছে গেলাম। আমার এবারের গন্তব্য সূর্যোদয়ের দেশ – জাপান!

বিকেল চারটার দিকে জাপানের রাজধানী টোকিওতে আমাদের প্লেন ল্যান্ড করল। টোকিওতে দুইটা বিমানবন্দর আছে – হানাদাতে একটা আর নারিতাতে আরেকটা। হানাদা টোকিও শহর থেকে কাছে। কিন্তু নারিতাতেই বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক প্লেন আসে। আমাদের বিমান নারিতাতেই নেমেছিল। টোকিওতে মে মাসের আবহাওয়া বেশ দারুণ ছিল – বেশি গরমও না আবার ঠাণ্ডাও না। ঢাকার প্রচণ্ড গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি মিলল এখানে এসে। প্লেন থেকে নামার সাথে সাথেই ঝলমলে রোদ্দুর আমাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। রানওয়েতে সারি সারি প্লেন রাখা দেখতে পেলাম। এয়ারবাস এ৩৮০ থেকে শুরু করে বোয়িংয়ের ড্রিমলাইনার ৭৮৭ – সব কিছুই চোখে পড়ল।

 

ইমিগ্রেশনের দিকে যাওয়ার পথে এয়ারপোর্টের ভেতরটা দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। ভেতরের পুরোটুকুই কার্পেট দিয়ে মোড়ানো। কেউ যে কাদা পায়ে এসে কার্পেট নোংরা করে দিতে পারে এই ভয় মনে হয় ওদের নেই। একটা প্যাসেজের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দুই পাশে কিছু বাঁশগাছ লাগানো দেখতে পেলাম – বেশ লাগছিল ওগুলো। ইমিগ্রেশনের লাইনে একদমই ভিড় ছিল না। কাউন্টার পর্যন্ত যাওয়ার আগেই একজন একটা যন্ত্রের সামনে আমাকে দাঁড় করাল। এরপর পাসপোর্ট স্ক্যান করে, আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে, আমার ছবি তুলে রাখল। ইমিগ্রেশন অফিসার খুব হাসিখুশি ছিলেন। আমাকে বলতে গেলে কোন প্রশ্ন না করেই ছেড়ে দিলেন।

এর পর লাগেজ সংগ্রহের পালা। সেখানেই জাপানিজদের নিয়ম মেনে চলার প্রথম নিদর্শন পেলাম। যেখান দিয়ে বিমানের লাগেজগুলো আসে তাকে কনভেয়ার বেল্ট বলে। এই বেল্টটা ঘুরতে থাকে আর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কর্মীরা বিমান থেকে ব্যাগ এনে এখানে রাখেন। যাত্রীরা নিজেদের ব্যাগ দেখতে পেলে সেটা তুলে নিয়ে চলে যান। কনভেয়ার বেল্ট থেকে হাত দু’য়েক দূরে একটা দাগ টানা থাকে, নিজের লাগেজ না আসা পর্যন্ত ওই দাগের ভেতরে ঢোকা নিষেধ। এই নিয়ম পৃথিবীর প্রায় সব বিমানবন্দরেই থাকে কিন্তু কাউকে সেভাবে এটা মেনে চলতে দেখিনি। জাপানে দেখলাম সবাই সেই লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন – দেখে মনে হচ্ছিল আগুন দিয়ে জায়গাটা ঘিরে রাখা, ভেতরে ঢুকলেই পা পুড়ে যাবে!

একটা সিমকার্ড আর শহরে যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়লাম। সবাইকেই দুইটা জিনিসে ট্রেনের ভেতর ব্যস্ত থাকতে দেখলাম – হয় তারা মোবাইলে গেম খেলছে অথবা বই পড়ছে। বইগুলো আবার উপর থেকে নিচে লেখা। কিছুক্ষণের ভেতরেই আমাদের কামরাটা ভর্তি হয়ে উঠল, কিন্তু পুরো ট্রেনটাই নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলছে না, কোন শব্দ নেই চারদিকে। আমরা দুই বাঙ্গালি এই নৈঃশব্দ ভাঙ্গার গুরুদায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিলাম!

আগে থেকেই হোটেল ঠিক করা ছিল, গুগল ম্যাপ দিয়ে খুঁজে পেতে সমস্যা হলনা। হোটেলে যেয়ে বুঝলাম যে আমাদের থাকার জায়গা মূল হোটেল থেকে দুই-তিনটা বিল্ডিং পরে – হোটেলের একটা এক্সটেনশনে। হোটেলে চেক ইন করার সময় আমাদেরকে হাতে দুইটা কার্ড দিয়ে দিল। আমাদের বিল্ডিংয়ে এসে দেখলাম যে কাঁচ দিয়ে ঘেরা মেইন দরজাটা বন্ধ। কার্ডটা দরজার বাইরে লাগানো একটা সেন্সরে রাখতেই অটোমেটিক্যালি দরজাটা খুলে গেল। হোটেলের ভেতরে একটা কর্মচারীও চোখে পড়ল না – আমরা ভেতরে ঢুকে লিফটে করে নয় তলাতে আমাদের রুমে এসে পড়লাম। টোকিও পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের একটি – এখানে থাকার জায়গার দাম অসম্ভব বেশি। তাই আমাদের রুমের আকার দেখে খুব একটা অবাক হলাম না। তবে অবাক হলাম আসলে এত ছোট জায়গার ভেতর সব কিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থা দেখে। এই ছোট্ট রুমটায় জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে। টিভি, ফ্রিজ, এসি, আয়রন, টর্চলাইট, দুইটা আয়না, টেবিল ল্যাম্প, টেবিল, চেয়ার, কফি মেকার, শু শাইনার, কাগজ, কলম, সাবান, শ্যাম্পু, শেভিং ফোম, রেজর, পেস্ট, ব্রাশ, কান পরিষ্কারের কটন বাড, গ্রিন টি, হেয়ার ড্রায়ার, জামা কাপড় রাখার ক্যাবিনেট, অ্যালার্ম সহ ঘড়ি – কি নাই এখানে! এমনকি রাতে পরার জন্য একটা নাইট ড্রেসও প্যাকেটে করে রাখা বিছানার ওপর। একটু খুঁজতে ঘরে পরার স্যান্ডেলও পেয়ে গেলাম। যতই খুঁজতে লাগলাম ততই নতুন কিছু না কিছু পেতে লাগলাম! এত ছোট্ট একটা ঘরে যে এত গুপ্তধন লুকিয়ে আছে কে জানত!

পরবর্তী চমক লুকিয়ে ছিল টয়লেটে। টয়লেটের ভেতরে ঢুকে কমোডের ওপর নানা ধরণের বাটন দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। এখানে বসে কাজ শেষ করে মান সম্মান নিয়ে ফিরতে পারব তো! একটু সাহস সঞ্চয় করে বড় একটা শ্বাস নিয়ে চোখ খুললাম। কমোডের ওপর বসে বসে সব কিছু বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এইদিকে জৈবিক ক্রিয়াও বন্ধ নেই। গবেষণায় এতই মগ্ন ছিলাম যে অন্যদিকে খেয়াল রাখতে পারিনি।  হঠাৎ করে টুপুস করে একটা শব্দে লজ্জা পেয়ে গেলাম – বাইরের কেউ শুনে ফেলল না তো! তখনই বুঝতে পারলাম যে একটা বাটন চেপে দিলেই সুমধুর বাজনা বাজা শুরু হয়ে যাবে, আপনি ভেতরে কি করছেন, কত ডেসিবেলের শব্দ তৈরি করছেন এটা বাইরের কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। এরপর, আরেকটা বাটনে চাপ দেওয়ার সাথে সাথেই যে কমোডের ওপর বসে আছি সেটা গরম হয়ে গেল। আহ! কী আরাম! বুঝতে পারলাম যে, কতটুকু গরম হবে এটাও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আরেকটা বাটনে চাপ দেওয়ার সাথে সাথে জেম্‌স বন্ড সিনেমার কোনও দৃশ্যের মত কমোডের ভেতর দিয়ে একটা নজল বের হয়ে আসল। এরপর সেই নজল থেকে পানির ফোয়ারা নিচ থেকে ওপরে একেবারে জায়গা মত এসে আমাকে পরিষ্কার করা শুরু করল। এই পানির গতি বাড়ানো-কমানোও সম্ভব। আর মেয়েদের জন্য আছে একটু ভিন্ন এক উপায়। পানি এক জায়গায় না এসে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ক্রমান্বয়ে ঘুরে ঘুরে আসে। এই অসাধারণ কমোড বানানোর সবচেয়ে নামি প্রতিষ্ঠানের নাম “টো টো”। এই প্রতিষ্ঠানের নাম থেকেই বাংলায় “টো টো কোম্পানির ম্যানেজার” কথাটা এসেছে কিনা কে জানে! এসব ভাবতে ভাবতে যে কতটা সময় কমোডের ওপর বসেই পার করে দিয়েছি কে জানে! সম্বিত ফিরে পেলাম রুম মেটের দরজা ধাক্কানোর শব্দে। এবারের মত উঠি তাহলে?

 

এই মুহূর্তে টোকিওর উয়েনো পার্কে বসে লিখছি – মস্ত বড় পার্ক, সবুজ গাছ দিয়ে চারদিক ছাওয়া। এর মাঝ দিয়েই ফাঁকে ফাঁকে হাঁটার জন্য পেভমেন্ট। আজকে রবিবার – ছুটির দিন, প্রচণ্ড ভিড় এই পার্কে। সবাই খুব শৃঙ্খলাবদ্ধ – বাবা – মায়েরা তাদের বাচ্চাদেরকে নিয়ে ঘুরতে  এসেছেন।  আমাদের দেশের মত কিন্তু কোন বাচ্চাকেই কোলে দেখা যাচ্ছে না – বেশীরভাগই স্ট্রলারের ভেতর চুপ করে বসে বা শুয়ে আছে। কিছু বাচ্চা আবার বাই-সাইকেলের পেছনে একটা ক্যারিয়ারে করে আনা। যারা হাঁটতে পারে তারা গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে। সব গুলো বাচ্চাই একেবারে শান্ত-শিষ্ট, মুখ দিয়ে একটু শব্দও করছে না! যারা হাঁটছে তাদের পিঠে আবার ছোট্ট একটা ব্যাগও ঝোলান দেখতে পাচ্ছি – নিশ্চয়ই ওদের ব্যবহারের জিনিসপত্র ভেতরে আছে। গোলাপি রঙের ব্যাগ, সাথে গোলাপি রঙের জামা – জুতো, ফুটফুটে বাচ্চাগুলোকে মনে হচ্ছে এক একটা দেবশিশু! পৃথিবীর এই একটা জিনিস মনে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীন ভাবে দেখে যাওয়া যায়।

বাবা-মা, বাচ্চা ছাড়াও একটা বিশাল অংশ চোখে  পড়ছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের! একেবারে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, তাও পার্কে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একজন জাপানি নাগরিক গড়ে পঁচাশি বছর বাঁচেন। সংখ্যার দিকে থেকে জাপানিজদের মত এত বয়স্ক জীবিত মানুষ পৃথিবীর আর কোথাও এই মুহূর্তে নেই। জাপানে প্রতি একশ জন মানুষের ভেতর তেত্রিশ জন মানুষের বয়সই ষাট বছরের বেশি। এই জন্যই জাপানিজরা বেশ চিন্তায় আছে – আজ থেকে কয়েকবছর পর কাজ করার মত যথেষ্ট শক্তিশালী মানুষ হয়ত ওখানে পাওয়া যাবে না।  তবে, মানুষদের মুখের দিকে তাকিয়ে বয়সের আন্দাজ পাওয়া যথেষ্ট কঠিন। সবাই শারীরিক ভাবে এত ফিট আর কর্মোদ্যমী যে বয়স্ক মানুষ আলাদা করা যায় না। শুধু বয়সের কারনে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটলে কিছুটা টের পাওয়া যায়।

বয়স্ক জেনারেশনের সাথে অল্প বয়সী জেনারেশনের একটা পার্থক্য চোখে পড়ল। একটু যাদের বয়স বেশি তারা একেবারে টিপটপ। শার্ট-প্যান্ট ইন করে, বেল্ট কোমরে বেঁধে, রঙ করা জুতা পায়ে পরে হাঁটছেন। অনেকের গায়ে আবার কালো রঙের স্যুটও দেখলাম – পার্কের ভেতরেই! আর, যাদের বয়স কম তারা গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট অথবা জিন্স পরে আছেন।

পার্কে ঢোকার আগে গেটের মুখে একজন লোক পারফর্ম করছিলেন। জেমস বন্ড সিনেমার থিম মিউজিক শুনে থামলাম। এরপর শুরু হল মিশন ইম্পসিবলের মিউজিকের সাথে অভিনয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে শব্দ হচ্ছে আর তার সাথে মিলিয়ে অভিনয়। সে কী বাস্তব এক্সপ্রেশন! গাড়ি চলার শব্দ হওয়ার সাথে সাথেই লোকটা একটা বাক্সের ওপর উঠে পড়ল। পেছন থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসতেই মাথা নিচু হয়ে গেল – গাড়ি কখনো বা ডানে আবার কখনো বা বামে। গাড়ির হার্ড ব্রেকের শব্দের সাথে সাথে গাড়ি রূপি বাক্সটা স্কিড করে ঘুরে গেল। আর টম ক্রুজের দৌড়ানোর ভঙ্গি নকল করে অল্প একটা জায়গার ভেতর লোকটির দৌড়ানোর অভিনয় তো অনবদ্য বললেও কম বলা হয়! এই লোকের মতই আরও কিছু স্ট্রিট পারফর্মারকে পারফর্ম করতে দেখলাম। সব জায়গাতেই লোকজন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে এবং শেষে উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দিচ্ছে।

উয়েনো পার্কের ভেতরে কিছুদূর হাঁটলেই, টোকিও জাতীয় জাদুঘর। এই জাদুঘরে কয়েকটা বিল্ডিং আছে, এর মাঝে প্রধান বিল্ডিংটা ট্র্যাডিশনাল জাপানিজ স্টাইলে তৈরি। জাদুঘরে ঢুকলে যেকোন জাদুঘরে ঢুকলেই যে কিভাবে আমার সময় চলে যায় টা আমি একদমই টের পাইনা। এইজন্য হাতে কম সময় থাকলে আমি জাদুঘরে যেতে চাইনা। ফ্রান্সের ল্যুভর, ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ মিউজিয়াম অথবা কায়রোর ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম – এগুলোর প্রতিটাতেই সেই সকালে ঢুকে ধুঁকতে ধুঁকতে রাতে বের হয়ে কানে ধরেছিলাম – এই শেষ, আর জীবনেও জাদুঘরে ঢুকবো না। কিন্তু কোন নতুন জায়গায় গেলেই কিভাবে কিভাবে যেন ওখানে যেয়েই হাজির হই, এবারও সেই ফাঁদে ধরা দিয়েছি। যুগে যুগে বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশগুলো দখল করে কলোনি বানিয়েছে। মজার ব্যাপার হল – এশিয়ার অনেক দেশই অনেকেই দখল করলেও জাপানকে কেউ কোনদিন দখল করতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বাদ দিলে, একবার মঙ্গোলরা চেষ্টা করেছিল – টর্নেডো – টাইফুনের পাল্লায় পড়ে জান নিয়ে পালিয়েছে। যেহেতু কেউ কোনদিন জাপানে এসে ছড়ি ঘোরাতে পারেনি তাই ওদের শিল্প সংস্কৃতি মোটামুটি নিজেদেরই আছে, অন্যের প্রভাব এখানে কম। জাদুঘরের এক রুম থেকে অন্য রুমে যেতে যেতে যেতে জাপানের বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন এলাকার ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতি চোখের সামনে যখন আসতে লাগল তখন এগুলো দিব্যি টের পাচ্ছিলাম। এর ভেতর সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল – অপরূপ সুন্দর সব তৈজসপত্র – খাবার বাটি, প্লেট, রং বেরং এর কাপড় – বিশেষ করে মেয়েদের। এগুলো সবকিছুকে ছাড়িয়ে মনে গেঁথে গেল জাপানের তৈরি তলোয়ার! কত রকমের তলোয়ার যে আছে! চোকুতো (এক পাশে ধার ওয়ালা সোজা তলোয়ার), কেন্‌ (দুই পাশেই ধার ওয়ালা সোজা তলোয়ার), তাচি (বড় – বাঁকানো তলোয়ার), কোদাচি (তাচির মতই কিন্তু ছোট), ওদাচি (অনেক বড় তলোয়ার – বড় তাচিও বলা যায়), কাতানা (বাঁকানো ব্লেডওয়ালা ট্র্যাডিশনাল তলোয়ার), ইয়ারি (বর্শার মত), তানতো(চাকু বা ড্যাগার)। এই যে এত রকমের তলোয়ারের নাম বললাম, এদের প্রত্যেকটার ব্লেডই কিন্তু আলাদা রকমের আর তলোয়ারের প্রত্যেকটা অংশেরই আলাদা আলাদা নাম আছে। তলোয়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন ধরণের বর্ম আর মাথার জন্য শিরস্ত্রান। থরে থরে সাজানো তলোয়ার দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল আর মনে পড়ে যাচ্ছিল কিল বিল সিনেমার কথা। প্রাচীনকালে যারা তলোয়ার তৈরি করতেন তাদেরকে অনেক সম্মান করা হত। কোনও একটা তলোয়ার তৈরির কাজ শুরু করার আগে রীতিমত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। আর তলোয়ার তৈরির চেয়ে তলোয়ার পালিশ করে চকচকে করাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না! তলোয়ার ধারাল আর চকচকে হলেই হবে না, কারুকাজ ও থাকতে হবে! সব মিলিয়ে এলাহি কারবার। তলোয়ার তো বানানো হল। এখন এগুলোর ধার কিভাবে পরীক্ষা করা হবে? প্রথমে এগুলোর ধার লাশের ওপর দিয়ে যেত, এরপর এর স্বাদ পেত আটকে থাকা বন্দিরা!

টোকিও’র রাস্তায় খাবারের গন্ধে হাঁটাই দায়! মোড়ে মোড়ে শুধু রেস্তোরাঁ চোখে পড়ে আর নাকে এসে ধাক্কা দেয় পেটে মোচড় দেওয়া খাবারের সুঘ্রাণ! এত ঘন ঘন এত রেস্তোরাঁ পৃথিবীর আর কোন শহরেই আমার চোখে পড়েনি। প্রায় সব দোকানের জানালাতে অথবা ডিসপ্লেতে সেই দোকানে কি কি খাবার আছে আর অবিকল রেপ্লিকা সাজানো থাকে সেই সব খাবারের দাম সহ। রেপ্লিকাগুলো এত বেশি জীবন্ত যে আমি প্রথমে ওগুলোকে দেখে রান্না করা আসল খাবার মনে করেছিলাম। নুডুলসের কথাই ধরা যাক। পেঁচিয়ে রাখা নুডুলস, পাশে একটা চিংড়ি মাছ আর একটা বাটিতে ভাত – ব্যাস! ছবি দেখেই যে নিজের অজান্তে আপনি রেস্তোরাঁর ভেতর ঢুকে যাবেন তা নিজেই বুঝতে পারবেন না! জাপানিজরা খুবই স্বাস্থ্য সচেতন। জাপানে মোটা লোক আপনার চোখেই পড়বে না। তাই ফাস্ট ফুডের দোকান খুবই কম। সব দোকানেই জাপানিজ অথবা চাইনিজ খাবার রান্না হয়। আমরা যেমন গামলা গামলা ভাত খাই, জাপানিজরা খায় নুডলস! রামেন, সোবা, উদন, ইয়াকিসোবা, সোমেন – এগুলো সবই নুডলসের নাম। এগুলোর মাঝে ইয়াকিসোবা ছাড়া বাকি সব গুলোই স্যুপের ভেতরে করে সার্ভ করে। ভেতরে অনেকসময় মাছ অথবা মাংসও থাকে। আর ওরা একটা ছোট্ট বাটিতে করে স্টিকি রাইস খায়। সস আর মূলাজাতীয় শাকসবজি থাকে সাথে। আর এগুলো খেতে হয় সরু দুইটা কাঠি দিয়ে – যাকে ভদ্র ভাষায় আমরা চপস্টিক বলে থাকি। বুক ফুলিয়ে চপস্টিক দিয়ে খেতে যেয়ে কম হেনস্থা হতে হয়নি। একই সময় অর্ডার দিয়ে আশ-পাশের সবাই খেয়ে দেয়ে উঠে চলে গেল আর আমি একটা একটা করে ভাত তিন-চার বারের চেষ্টায় মুখে পুরছি! কি যে বিপদ রে ভাই! এর চেয়ে প্রণ টেম্পুরা ঢের ভাল। একধরনের ক্রিস্পি আবরণ দিয়ে চিংড়ি ভেজে দেয় – ধরে মুখে পুরে দিলেই ঝামেলা শেষ। আর টফুও খারাপ ছিল না!

রাস্তা দিয়ে ইতিউতি হাঁটছিলাম, এক জায়গায় ভিড় দেখে দাঁড়ালাম। একটা বড় মোটর সাইকেলের পিঠে চড়ে অনেকেই ছবি তুলছে। একটু খেয়াল করতেই বুঝলাম যে ওটা পুলিশের মোটর সাইকেল। আসে পাশে কিছু পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আর তাদের পেছনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংয়ের গায়ে বড় বড় করে লেখা দেখতে পেলাম – ‘পুলিশ মিউজিয়াম’ – পুলিশ যাদুঘর! অনেকরকমের যাদুঘরে গিয়েছি জীবনে, পুলিশ যাদুঘরে তো কখনই যাওয়া হয়নি। কৌতূহল নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সাথে সাথেই একজন মাথা নুইয়ে আমাদেরকে অভিবাদন জানিয়ে লিফটে করে ছয়তলায় পাঠিয়ে দিল। পুরো ছয় তলা বিল্ডিং জুড়েই যাদুঘরটি, আমাদেরকে সবার ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছে যেন সিঁড়িতে করে এক তলা করে নামি আর সবকিছুই দেখতে পাই। ভেতরে ডিসপ্লেতে টোকিও পুলিশের ইতিহাস, খ্যাতিমান পুলিশদের ছবিসহ জীবন কাহিনী, তাদের বীরত্বগাথা, বিভিন্ন র‍্যাঙ্কের পরিচিতি, পোশাকের রংসহ বর্ণনা চোখে পড়ল। এগুলোর বাইরে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লাগল বিভিন্ন ধরণের ইন্টারেক্টিভ গেম আর ভিডিও দেখে। ওগুলো বিশেষ ভাবে ছোটদের জন্য বানানো। যেমন এক জায়গায় একটা ভিডিও চলছে – সামনে যাদুঘরে আসা একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে। জাপানিজ ভাষায় ভিডিওতে বলা শুরু করল যে মনে কর তুমি বাসার ঠিক বাইরে খেলছ। এমন সময় একজন অপরিচিত লোক তোমাকে এসে বলল যে তার কুকুরছানাটি হারিয়ে গিয়েছে। তার সাথে যেয়ে এটা খুঁজে দিতে হবে। তুমি কি তার সাথে যাবে? এমন সময় ভিডিওটি সাময়িকভাবে থেমে গেল আর টাচস্ক্রিনে হ্যাঁ/না‘র অপশন আসল। বাচ্চাটির সিলেকশনের পর কি করা উচিত এটা বর্ণনা করে পরের ধাপে চলে যাবে। আরেক জায়গায় দেখলাম একটা খেলনা সাইকেল রাখা – ওটা আসলে একটা সিমুলেটেড ভিডিও গেম। ওটার ওপরে উঠে সাইকেল চালানো শুরু করলে মনিটরে টোকিও’র রাস্তার একটা ছবি আসে – সেখানে দোকান-পাট, মানুষজন, পশু-পাখি, গাড়ি সবই আছে। এগুলোর মাঝখান দিয়েই সাইকেল চলছে। একটা চৌ-রাস্তার মোড়ে এখন সাইকেল, এমন সময় ট্র্যাফিক সিগনালের রং লাল হয়ে গেল। এখন বাচ্চাটি কি করবে? রাস্তা পার হবে না সাইকেলটি থামিয়ে ফেলবে? এভাবেই গেমের মাধ্যমে রাস্তায় না নেমেই বাচ্চাটি রাস্তায় নামলে কি কি ঘটতে পারে তার একটা ধারণা পাচ্ছে, ট্র্যাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে হাতে কলমে শিখছে। আবার একটা রুমে ছোট দৈর্ঘ্যের সিনেমা দেখতে পেলাম। একটা কুকুর আমাদেরকে গল্প শোনাল – কিভাবে সে ডগ স্কোয়াডে যোগ দিল, কিভাবে একটু একটু করে প্রতিদিন ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নতুন জিনিস শিখল, কিভাবে সে একটা পুলিশ হয়ে উঠল আর এখন কিভাবে সে অপরাধী ধরে ফেলছে প্রতিদিন! সবমিলিয়ে একেবারে জমজমাট অবস্থা, বাচ্চারা নিজের অজান্তেই হাসতে হাসতে আর খেলতে খেলতে আইন কানুন মেনে চলার শিক্ষা পাচ্ছে। আর পুলিশের পোশাক পরে, হেলিকপ্টারের ভেতরে অথবা মোটর সাইকেলের ওপরে যখন সুন্দর একটা হাসি দিয়ে ছবি তুলছে তখন কি তার মনে পুলিশ হয়ে শহর রক্ষা করার স্বপ্নও গেঁথে যাচ্ছে না? ওহ! বের হয়ে যাওয়ার সময় আমাকে বিদেশি পেয়ে এক পুলিশ জোর করে মোটর সাইকেলের ওপরে তুলে দিতে চাইছিল – বলল যে সেই ছবি তুলে দিবে! সব বাচ্চাদের ভিড়ে আমি এক বুড়ো, মোটর সাইকেলের ওপর উঠে ছবি তুলেছিলাম কিনা সেটা এখন নাইবা বললাম!

টোকিওতে উঁচু দালানের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না। এই শহরে তিন কোটির উপর মানুষ থাকে। এজন্য এত উঁচু উঁচু দালান-কোঠা বানানোর পরও জায়গার ভীষণ অভাব। বেশীরভাগ মানুষই এক বেডরূমের বাসাতে থাকে। এহেন আকাশছোঁয়া ভবনগুলো রাতের বেলায় এক অন্য রূপে সাজে যখন সব সাদা, লাল আর হলদে আলো একসাথে জ্বলে ওঠে। টোকিওর রাতের রূপলাবণ্য দেখতে হলে কয়েকটা জায়গায় না গেলেই নয় – এগুলো হল আকিয়াবারা, শিবুয়া, সিনজুকু, আর ইকেবুকুরো। আকিয়াবারাতে হাজার হাজার ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান আছে – হাজার হাজার যখন বললাম তখন কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলিনি। এখানে ইলেক্ট্রনিক্সের এমন কোন জিনিস নেই যে পাবেন না। ল্যাপটপ, ফোন, টেলিভিশন থেকে শুরু করে গেমিং কনসোল, ডিভিডি – সবই এখানে পাওয়া যায়। ছেলেমেয়েদেরকে চুলে রং লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। অনেক দোকানে এনিম – মাঙ্গার বিভিন্ন চরিত্রের ছবি টাঙ্গানো। পাশাপাশি বড় বড় স্ক্রিনেও কিছু না কিছু দেখাচ্ছে – ওগুলোতে এনিম চলছে না গেম এটা বোঝাই দুষ্কর। এর মাঝে গেম খেলারও দোকান দেখলাম, আগে যেমন আমাদের পাড়ার মোড়ে মোস্তফা – জ্যাক – হান্নার গেম খেলতাম। পার্থক্য হল, ওই দোকান গুলো বিশাল বড়, গেমের সংখ্যা অগুনতি, আর ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে পাগলের মত সবাই খেলছে।  সবাই যে আর পৃথিবীতে নেই, অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছে, এটা তাদেরকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আর শিবুয়াতে আপনাকে যেতে হবে মানুষজনের রাস্তা পার হওয়া দেখতে। দুই মিনিট পর পর রাস্তা পার হওয়ার সিগন্যাল সবুজ হয়। সাথে সাথেই অনেক চওড়া রাস্তার দুই পাশ থেকেই লোকজন পিঁপড়ার মতন রাস্তার একপাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া শুরু করে । শিবুয়ার ক্রসিং দিয়েই পৃথিবীর ভেতর সবচেয়ে বেশি মানুষ রাস্তা পার হয়। আরও বেশি মজা লাগে বৃষ্টির সময় যখন শত শত মানুষ ছাতা মাথায় রাস্তা পার হয় – ছাতার ঢেউ একে অন্যকে এড়িয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। আজ থেকে শ খানেক বছর আগে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর তার কুকুর – হাচিকোকে নিয়ে এই শিবুয়া স্টেশনে আসতেন। তিনি চলে যেতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর হাচিকো তাকে বিদায় দিয়ে বাসাতে। আবার তার ফেরার সময় হলে, হাচিকো ঠিকই চলে আসত স্টেশনে। বছর খানেক এভাবেই চলছিল। একদিন সেই প্রফেসর আচমকাই না ফেরার দেশে চলে যান। বেচারা হাচিকো সেটা কিভাবে বুঝবে! সে প্রতিদিন যথারীতি তার মনিবের জন্য স্টেশনে এসে বসে থাকত। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত পরবর্তি নয় বছর হাচিকো প্রতিদিন শিবুয়া স্টেশনে এসেছিল তার বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে এই আশাতে। হাচিকো আজ না থাকলেও – হাচিকোর একটা মূর্তি শিবুয়া স্টেশনের বাইরে আছে। এই ঘটনা নিয়ে একটা সিনেমাও হয়েছে – “হাচিঃ এ ডগস টেইল” নামে। আপনি যদি টোকিওতে কারও সাথে দেখা করতে চান তাহলে নিশ্চিন্তে হাচিকোর মূর্তির কথা বলে দিতে পারেন। এই কুকুরের মুর্তিটিই টোকিওতে মানুষের সাথে প্রথমবারের মত দেখা করার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা।

 

টোকিও এর মেট্রো সিস্টেমের মত এত কমপ্লেক্স মেট্রো আমি খুব বেশি দেখিনি। এখনই একটু পড়া থামিয়ে আপনারা ইন্টারনেটে “Tokyo metro map” দিয়ে সার্চ করে ম্যাপটি দেখে নিন। কি? মাথা ঘুরে উঠল না? আপনি কিন্তু একা নন, আমারও মাথা ঘুরে উঠেছিল। দেখতে যতই কমপ্লেক্স হোক না কেন, টোকিও শহরের অনেকটাই এটা দিয়ে কাভার করা। ঢাকাতে যেমন আন্দাজে কিছুদূর হাঁটলেই ডাচ-বাংলা ব্যাঙ্কের এটিএম বুথ চোখে পড়ে, তেমনি টোকিওতে আরও কম হাঁটলেই একটা মেট্রো স্টেশন চোখে পড়বে। মেট্রোর ভেতরটা যে কি অসম্ভব রকমের পরিষ্কার সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মজার ব্যপার হল, আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা ডাস্টবিনও নেই, এমনকি টোকিও শহরেই কোনও ময়লা ফেলার বিন চোখে দেখা যায় না। সবাই চলার পথের প্রতিদিনকার সব ময়লা তাদের ব্যাগে করে বাসায় নিয়ে যায়, এরপর তাদের নিজেদের বিনে ফেলে। টোকিও এর এই মেট্রোই কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত মেট্রো আর শিনজুকু স্টেশন হল ব্যস্ততম মেট্রো ষ্টেশন – এটাও সারা পৃথিবীর মাঝে! সন্ধ্যার পর যখন অনেক ভিড় হয় আর লোকজন ট্রেনে ওঠে তখন এর দরজা অনেকসময়ই মানুষের জন্য বন্ধ করা যায় না। এইজন্য দরজার বাইরে দুইজন লোক দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের কাজ হল লোকজনদেরকে ভেতরে ঠেলে দিয়ে বগির দরজা বন্ধ করা। কিন্তু এত ভিড়ের মাঝেও এতটুকু বিশৃঙ্খলা কোথাও নেই। ট্রেন এসে প্লাটফর্মে থামলে বগির দরজা কোথায় থাকবে এটার চিহ্ন প্লাটফর্মেই দেওয়া আছে। সবাই ট্রেন আসার আগেই লাইন ধরে প্রত্যেকটা বগির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ট্রেন এসে যখন থামে আর দরজা খুলে যায় তখনই কিন্তু সবাই হুড়মুড়িয়ে ট্রেনের ভেতরে উঠতে চায় না, যারা নামবেন তাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। নামা শেষ হলে সবাই একে একে উঠে পড়ে ভেতরে। ট্রেনের ভেতর যত ভিড়ই থাকুক না কেন, কোন শব্দ নেই। আন্ডারগ্রাউন্ডেও ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে। যারা বই পড়ছে না তারা হয় মোবাইলে চ্যাট করে অথবা ভিডিও দেখে – ফোনে কেউ কথা বলে না। অনেকেই আবার সিটে বসেই ঘুমিয়ে যায়, কিন্তু গন্তব্যে আসলে ঠিকই উঠে পড়ে নেমে যায়  – একটু আগেও নয়, পরেও নয়। আসলে, ট্রেন তো একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে, তাই সবাই জানেন যে ঠিক কখন তার ট্রেন থেকে নামতে হবে। সেই অনুযায়ী তারা মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখে, আর কানে থাকে হেডফোন। জায়গায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই মোবাইলের এলার্ম কাউকে ডিস্টার্ব না করেই কানে জানিয়ে দেয়, আর ঘুমন্ত মানুষটা জীবন্ত হয়ে দুই লাফ দিয়ে ট্রেনের বাইরে! ট্রেন থেকে নেমে বা ট্রেনে ওঠার আগে যদি কারও খিদে লেগে যায় তার জন্যও মাটির নিচেই ব্যবস্থা আছে। বড় বড় ভেন্ডিং মেশিনের ভেতরে চকলেট, বিস্কুট থেকে শুরু করে গ্রিন টি, ড্রিংকস সবই রাখা আছে। প্রত্যেকটা জিনিসের পাশে দাম লেখা আছে। সেই অনুযায়ী পয়সা দিলে তার সমান অথবা কমদামী খাবারগুলোর পাশের বাটনের বাতি জ্বলে ওঠে। সেখানে চাপ দিলেই সেই খাবার বের হয়ে আসবে আর বাড়তি পয়সাগুলো ফেরত দিয়ে দিবে। তবে কেউই কিন্তু ভুলেও খেতে খেতে মেট্রো ট্রেনের ভেতর ওঠে না। আর প্রত্যেকটা স্টেশনেই টয়লেট আছে – বিনা পয়সায় ব্যবহার করা যায়(একবার সুইজারল্যান্ডের এক স্টেশনে ছোট কাজ করে দেড়শ টাকার মত দিয়ে আসতে হয়েছিল, সে কথা মনে হলে এখনো বুকে ব্যথা হয়, নেদারল্যান্ডসে তো ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানে ঢুকে, খাবার অর্ডার দিয়েও, টয়লেটে যাওয়ার জন্য টাকা না দেওয়ার হাত থেকে নিস্তার পাইনি!)। বিনা পয়সার টয়লেট হলেও ভেতরটা কিন্তু ভীষণ পরিষ্কার। আরও অনেক কিছুর সাথেই অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্যতা কথাটা কোনোভাবেই জাপানিজদের সাথে যায় না!

ছোট বেলায় মাগুর মাছের মত মুখ ওয়ালা সাদা রঙের বিশাল এক ধরণের ট্রেন বইয়ের পাতায় দেখেছিলাম।  এগুলোকে নাকি বুলেট ট্রেন বলে – চোখের পলক ফেলার আগেই এগুলো জাপানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেতে পারে। জাপানে যাওয়ার আগে জানলাম যে এই ট্রেনগুলোকে জাপানিজরা ‘শিনকানসেন’ বলে। নজোমি, হিকারি আর কোদামা – গতির তারতম্যের উপর নির্ভর করে এই তিন রকমের শিনকানসেন চলে জাপানে। এগুলোর গতি এমন যে ঢাকা থেকে এই ধরণের ট্রেন চললে চট্টগ্রামে পৌঁছাতে আপনার স্রেফ এক ঘণ্টা সময় লাগবে! জাপানে যাচ্ছি, কিন্তু এমন ট্রেনে চড়ব না, তাই কি হয়? কিন্তু এই স্বপ্নে বাঁধ সাধল টিকিটের প্রচণ্ড দাম। ইচ্ছে ছিল টোকিও থেকে কিয়োতো যাব – সাথে সময় হলে মাউন্ট ফুজি। কিন্তু এই পথে শিনকানসেনে যাওয়া আসা করতে টিকিটের দাম সাতাশ হাজার ইয়েন, বাংলাদেশী টাকায় প্রায় চব্বিশ হাজার টাকা। এই টাকায় তো ঢাকা থেকে ব্যাংকক যেয়ে আবার ফিরেও আসা যায়। এত টাকা দিয়ে ট্রেনে চড়ার চিন্তা তাই তখনকার মত বাদ দিলাম। কিন্তু যতই সময় গড়াতে লাগল ততই মনে হতে লাগল যে, কি আছে জীবনে – ক্রেডিট কার্ডের কাছে না হয় একটু হাতই পাতলাম! জাপান যেয়ে এক বেলা না হয় কমই খেলাম। মনের সাথে এমন ভয়ানক দ্বন্দ্বের মাঝে একদিন ইন্টারনেটে দেখলাম যে উনত্রিশ হাজার ইয়েন দিয়ে ‘জেআর’ পাস পাওয়া যায়, যেটা দিয়ে সাত দিন যত খুশি আর প্রায় যেকোনো জায়গায় বুলেট ট্রেনে করে যাওয়া যায়। এই পাস শুধু বিদেশি পর্যটকরাই কিনতে পারবে আর জাপানের বাইরে থেকে কিনতে হবে। জাপানের ভেতর থেকে কিনতে হলে আরও বেশি টাকা দিতে হবে। তাই একটু খুঁজে অনলাইনে একটা ‘জেআর’ পাস কিনে ফেললাম আর ডেলিভারির জন্য হোটেলের ঠিকানা দিয়ে দিলাম। পাসটা হাতে পাওয়ার পর বুঝলাম যে ওটা সুদূর প্যারিস থেকে টোকিওতে এসেছে। আর ওটাও ঠিক পাস ছিল না, আমার নামে আসা একটা কাগজ ছিল যেটাকে এক্সচেঞ্জ অফার পেপার বলে। এই কাগজটা নিয়ে জেআর রেইলের অফিসে গেলে পাসপোর্ট চেক করে দেখে যে আমি আসলেই অল্প দিনের ভিসায় এসেছি কিনা, আর আমিই সেই লোক কিনা – এর পর সেই পাসটি ইস্যু করে দেয়। ট্রেন স্টেশনে ঢোকার সময় এই পাস দেখালেই ভেতরে ঢুকতে দেয়। আর পাসটি যেহেতু সাত দিনের জন্য ভ্যালিড(চৌদ্দ দিনেরও একটা পাস আছে, কিন্তু দাম বেশি) তাই পাসটি নেওয়ার সময় কবে থেকে এটা একটিভেট করতে চাই তা বলে দেওয়া যায়। আর দূরের পথে গেলে, আগে থেকে সিট রিজার্ভ করে নেওয়া ভাল, পাস নিয়ে টিকিট কাউন্টারে গেলেই সিট সহ টিকেট ইস্যু করে দিবে বিনা পয়সায়। যাইহোক, ওদের অফিস থেকে জেআর পাসটা নেওয়ার সময় দেখলাম যে এক কোনায় এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা বসে আছেন, জাপানের কোথায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় তার পরামর্শ দেওয়ার জন্য। তার কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করতেই এমন ভাবে আমাদেরকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিভিন্ন জায়গার নাম বলতে লাগলেন আর ম্যাপ বের করে দেখাতে লাগলেন, যেন ওসমস্ত জায়গায় না যেতে পারলে সমস্ত মানবজনমই বৃথা। যখন শুনলেন যে আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই, তখন খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন যে আমরা সব সুন্দর জায়গা এত কম সময়ে দেখে শেষ করতে পারব না। এরপর জিজ্ঞেস করলেন যে কোথা থেকে এসেছি।  যখন বললাম যে বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখন বারবার বললেন যে আবার এসো কিন্তু, তাহলে এবার যে সব জায়গা দেখতে পারছ না, সেগুলোও দেখতে পারবে। ভদ্রমহিলার আন্তরিকতা আমাকে ছুঁয়ে গেল – বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় আরও একবার সেদেশে যাওয়ার নিমন্ত্রণ পেলাম – আবার না গিয়ে কি থাকতে পারব?

পাস দেখিয়ে কাউন্টার থেকে একটা টিকেট হাতে নিয়ে রাত আটটার দিকে চড়ে বসলাম কিয়োতোর দিকে যাওয়া হিকারি শিনকানসেনে। যথারীতি, ঝকঝকে ট্রেন, সিটে বসে বুঝলাম যে পা’টা দিব্যি এলিয়ে বসা যায়, বেশ খানিকটা জায়গা আছে। ট্রেনের সবগুলো সিটই এমনভাবে বসানো যেন ট্রেন যেদিকে যায় সেদিকেই সবাই মুখ করে বসে থাকতে পারে। উল্টো দিকে বসে মাথা ঘুরে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কয়েকদিন পর যখন দিনের বেলায় ফিরছিলাম ট্রেনে করে তখন ট্রেনের গতি কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। বাইরের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না – চোখের পলকে বাড়ি -ঘর, রাস্তা – ঘাট, দূরের গাছ – ক্ষেত সব উধাও হয়ে যায়।

ট্রেন একেবারে যথাসময়ে ছাড়ল, এক সেকেন্ডের জন্যও এদিক-ওদিক হল না। ঝড়-বৃষ্টি, তুষারপাত, ভূমিকম্প, টাইফুন যাই হোক না কেন, এই ট্রেন যথাসময়ে ছেড়ে আপনাকে জায়গামত পৌঁছে দিবে এটা আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। ২০১৪ সালে যতগুলো বুলেট ট্রেন ছেড়েছে তাদের গড়ে দেরি হওয়ার সময় জানেন? প্রায় চুয়ান্ন সেকেন্ড!

ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই সুন্দর জামা পরা একটা মেয়ে সুর করে কথা বলতে বলতে ট্রলিতে করে খাবার নিয়ে হাজির। ওর কাছ থেকে কিছু কেনার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না, একটা কাপ আইসক্রিম নিয়ে বসলাম। একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করলাম – এত জোরে ট্রেন চলছে কিন্তু চা বা কফির কাপ থেকে এক ফোঁটাও ছলকে পড়ছে না। আর ট্রেনের ভেতর কোন শব্দ নেই, কেউ কোন কথা বলছে না, আমি অবশ্য এটাতে এখন ভালমতোই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ট্রেনের ভেতর টিকেট চেকার ভদ্রলোকটি বগিতে ঢোকার সময় আমাদেরকে একবার মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন। এরপর আমাদের বগি থেকে অন্য বগিতে ঢোকার সময় আবার ফিরে তাকালেন – আবার তার মাথা নত হয়ে গেল – আমাদেরকে আবারও অভিবাদন জানিয়ে চলে গেলেন। তিনি যতবার আসলেন আর গেলেন একই কাজ করলেন। তার এই মাথা নোয়ানো কোন যাত্রী দেখছেন কি দেখছেন না এটা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই – তিনি তার কাজটা ঠিকই করে যাচ্ছেন।

গত পঞ্চাশ বছর ধরে দশ বিলিয়নের ওপর যাত্রী পরিবহণ করেছে এই বুলেট ট্রেনগুলো। সারা পৃথিবীতে সাত বিলিয়ন লোক আছে, দশ বিলিয়ন মানে সারা পৃথিবীর মানুষের প্রায় দেড় গুন। এই দীর্ঘ পথ চলাতে কোনও দূর্ঘটনায় একজন মানুষও মারা যাননি। এই যে জাপানে এত ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়, টাইফুন আঘাত হানে এতেও কোনও সমস্যা হয়নি। ভূমিকম্প হলে নাকি এই ট্রেনগুলো টের পায় আর প্রায় তিনশ কিলোমিটার পার আওয়ার স্পিড থেকে মুহূর্তের মধ্যে ট্রেন থেমে যায়। ২০০৪ সালের প্রচণ্ড ভূমিকম্পে একবার ট্রেন থেমে যাওয়ার সময় কিছু বগি লাইন থেকে সরে গিয়েছিল – কোন যাত্রী এতে মারা যাননি, কিন্তু কেন ট্রেনের বগি লাইন থেকে সরে যাবে এটা নিয়ে জাপানে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল! বোঝেন অবস্থা! এগুলো ভাবতে ভাবতে রাত দশটা চল্লিশে আমরা কিয়োতোতে পৌঁছে গেলাম – দুই ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটেই। টোকিও থেকে কিয়োতোর দূরত্ব চারশ পঞ্চাশ কিলোমিটার – টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্বের ঠিক অর্ধেক। কিয়োতোর ট্রেন স্টেশন দেখার মত – গ্লাস স্ট্রাকচারে তৈরি বিশাল স্টেশন। এত রাতে স্টেশনের বাইরে এসে বুঝলাম যে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি মাথায় নিয়ে জাপানের পুরনো এই রাজধানীর বুকে আমাদের যাত্রা শুরু হল।

কিয়োতো টাওয়ারকে হাতের একপাশে রেখে রাতের অন্ধকারে কিয়োতোর হোটেলটা বের করলাম – চারিদিক নিঃস্তব্ধ। কিছু গাড়ি ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। হোটেলের রুমে ঢুকে বুঝলাম যে একটা ভুল করে ফেলেছি। অসাবধানবশত স্মোকিং রুম নিয়ে নিয়েছি যদিও আমি সিগারেট খাইনা। দশ তলার উপর দিয়ে রাস্তার দিকে মুখ করা জানালা দিয়ে দেখতে যদিও ভাল লাগছিল, অনভ্যস্ত গন্ধটা শান্তি দিচ্ছিল না। রাতের খাবার খাওয়াটা আর সেই অর্থে হল না – যাযাবর জীবনে এগুলোকে বেশি পাত্তা দিলে চলে না, কিছু ড্রাই খাবার খেয়ে পেট পানিতে ভরে ফেললাম। এরপর বিছানায় শুয়ে সেই পানির ছলাৎ ছল শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে পেট ভরে নাস্তা করে, ফ্রন্ট ডেস্কে বসে থাকা ভদ্রলোককে একটা নন-স্মোকিং রুমের আবদার করলাম। এর ফলে যদিও সেরকম একটা রুম জুটল, তবে হারালাম উঁচু তলায় থেকে চারদিকে দেখার সুযোগ আর পেলাম একটা ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র রুম – দুটো ইঁদুর কোনমতে থাকতে পারে, আমরা তো ইঁদুরের থেকে একটু হলেও বড়!

আরাশিয়ামা কিয়োতোর পশ্চিম দিকে পাহাড়ে ঘেরা একটা ছোট্ট সুন্দর গ্রাম। ট্রেন স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময়ই স্টেশনের ভেতর থেকেই দূরের পাহাড় দেখা যায়। অনেকেই দেখছি সেখানে দাঁড়িয়েই ছবি তুলছে। বাইরে পর্যটকে গিজগিজ করছে। এখানে একটা নদী আছে – সেই নদীর উপরে আছে এক ব্রিজ।এই ব্রিজের পশ্চিম দিকের নদীর নাম হোজু আর আর পূর্ব দিকে কাতসুরা। একই নদী, ব্রিজ পার হলেই নাম বদলে ফেলে!

রাস্তার দুপাশে জুড়েই দোকান – নানান জিনিসের পসরা। হাতে টানা টাঙ্গা রিক্সায় করে মানুষ জন যাচ্ছে। দেখে মনেই হচ্ছে না যে আধুনিক একটা দেশে একবিংশ শতাব্দীতে আছি – ঠিক যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক প্রাচীন শহর। মানুষজনের হাতে সবুজ রংয়ের আইসক্রিম দেখলাম – সবাই গপগপ করে খাচ্ছে। আইসক্রিম তো অনেক রঙের দেখেছি জীবনে, সাদা, ঘিয়ে, কালো, কিন্তু তাই বলে সবুজ রঙের আইসক্রিম! কৌতূহল সামলাতে না পেরে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম যে – “এটা কি ভেজিটেবল আইসক্রিম”? ‘সোনার কেল্লয়’য় – জটায়ু যেমন ফেলুদাকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন “ঊটকি কাঁটা খায়?” – আমার প্রশ্নটাও মনে হয় এমনই সরল ছিল। হাসি চাপতে না পেরে জটায়ুকে ফেলুদা কি উত্তর দিয়েছিলেন সেটা তো অনুমেয়ই, আমাদেরকে মেয়েটা হেসে বলল যে এটা ভেজিটেবল আইসক্রিম না গ্রিন টি আইসক্রিম। লজ্জা ঢাকার জন্য একটু তফাতে এসে একটা আইসক্রিম কিনে মুখে পুরেই তিতকুটে স্বাদকে ঢাকার জন্য মুখটা সোনারঙ্গা করে ফেললাম! এ জিনিস সবাই গপগপ করে খাচ্ছে কিভাবে? জাপানিজদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল!

ব্রিজটা পার হয়ে হাঁটতে লাগলাম – একসময় নিজেকে ভিড় আর কোলাহল থেকে বেশ কিছুটা দুরে আবিষ্কার করলাম। এক পাশে শান্ত নদী বয়ে চলছে, আর অন্য পাশে পাহাড়, আমি একটা সরু রাস্তায় কোন গন্তব্য ছাড়াই হাঁটছি। মাঝে মাঝে গ্রামের লোকজন হেঁটে অথবা সাইকেলে করে আমাদের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে সারি বেঁধে নীল রংয়ের নৌকা বাঁধা। একবার মনে হয়েছিল যে ওগুলো মনে হয় আমার জন্যই রাখা – লাফ দিয়ে উঠে ভেসে যাই নিরুদ্দেশে – কিন্তু এই বিদেশ বিভূঁইয়ে চোরের তকমা পড়ার ভয়ে সেটা আর করা হল না – যতই পুরনো দিনের আবহ থাকুক না কেন, এখনকার পৃথিবীটা তো নিদারুণ কঠিন।

এই শান্তির রাস্তা যে কোথায় যেয়ে শেষ হত তা আমাদের জানা ছিল না, তাই, একসময় মন না চাইলেও ঘুরে আবার অন্য দিকে হাঁটা দিতে হল – আমাদের সময় তো বড্ড কম। মিনিট বিশেক পরে এসে হাজির হলাম আরাশিয়ামার সেই বিখ্যাত বাঁশবাগানে। বাঙ্গালি হিসেবে বাঁশ বাগান নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়াটা রীতিমত ন্যাকামির পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু, এত বেশি সুন্দর সুন্দর সব ছবি দেখছি যে ওখানে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। আসলেই সুন্দর, আকাশ ছোঁয়া বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘন সবুজ রংয়ের বাগান। রাস্তার দুইপাশে পুরনো ঝরে যাওয়া বাঁশের পাতা দিয়ে তৈরি বেড়া আর মাঝখান দিয়ে হাঁটার জায়গা। সূর্যের আলো এই সবুজ ঝাঁকের মাঝ দিয়ে ঢোকার প্রাণপণ চেষ্টায় মগ্ন। এরকম এক আলোআঁধারির খেলায় বর্ণীল অপার্থিব মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা যেন গলে গলে পড়ছে এই রোমান্টিক আবহে। কেউ কেউ আবার সেজেগুজে সেই রিক্সা নিয়ে হাজির। প্রাণ প্রাচুর্যের অভাব নেই এই রঙ্গিন মঞ্চে।

আরাশিয়ামার রাস্তায় অনেক মাইকো আর গেইশা দেখতে পেলাম – মূলত টোকিও আর কিয়োতো জুড়েই এদের বাস। গেইশাদেরকে জাপানে এন্টারটেইনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মেয়েগুলো নাচ, গান, মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট বাজানো থেকে শুরু করে সুন্দর করে কথাও বলতে পারে। এদেরকে অনেকদিন ধরে এগুলোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় এদেরকে বলে মাইকো আর প্রশিক্ষণ শেষে হয় গেইশা। সাধারণত ষোল বছর বয়স থেকে শুরু হয় ট্রেইনিং আর গেইশা হতে হতে বয়স হয়ে যায় একুশ বছর। মুখে সাদা রং, পরনে হাতে বানানো সিল্কের তৈরি রংচংয়ে কিমানো, চুলের খোঁপা বিশেষ ভাবে বাঁধা, আর পায়ে সাদা মোজা পরা কাঠের জুতা – এই হল মোটামুটি গেইশাদের চেনার উপায়। চুলের খোঁপা বাঁধার ধরণ আর কিমানো দেখে কিন্তু মাইকো আর গেইশাকে আলাদা করা যায়। গেইশারা অবসর নেওয়ার আগে বিয়ে করতে পারে না। গেইশাদের জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে মেমোয়ের্‌স অফ গেইশা বইটি পড়তে পারেন। একই নামে একটা মুভিও আছে।

 

আরাশিয়ামা কে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম ফুসিমি-কু তে। এখানেই আছে কিয়োতোর সবচেয়ে বিখ্যাত স্রাইন(আমরা যাকে খাঁটি বাংলায় মাজার বলি) – “ফুসিমি ইনারি তাইশা”। ইনারি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই স্রাইন সেই সাতশ শতাব্দীতে তৈরি  – সবচেয়ে বড় স্রাইনটা আছে পাহাড়ের ওপরে, আর ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট স্রাইন। ঢোকার মেইন গেট টা তো অসাধারণ – বিশাল আর কারুকার্যময়! পাহাড়ের ওপরে ওঠার পথ প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা আর ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। সিঁড়িকে ঘিরে সাপের মত প্যাঁচ কেটে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গেট – যেগুলোকে টোরি গেট বলে। এই গেটগুলোর ওপরের অংশের রং সিঁদুর আর কমলার মাঝামাঝি আর নিচের অংশ কাল। গেটের পিলারের গায়ে জাপানি ভাষায় কি যেন সব লেখা। গেটের ভেতর দিয়ে আলোর খেলা দেখতে দেখতে ওপরে উঠতে লাগলাম। মাঝে মাঝে যে মাথাটা একটু ঘুরে উঠছিল এটা অস্বীকার করব না, একই রকমের এতগুলো গেট ঘিরে আছে – মাথায় আর ধরছিল না। মোটামুটি ঘণ্টা দুয়েকের ভেতরেই পাহাড়ের চুড়ায় পৌঁছে গেলাম। স্রাইন দেখে খুব একটা মন না ভরলেও, উপর থেকে দেখা কিয়োতো শহরটা ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। এই ইনারিকে জাপানিজরা মনে করত ভাত দেওয়ার দেবতা – এজন্য ব্যবসায়ীরা এই স্রাইনের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। প্রত্যেকটা টোরি গেটই কোন না কোন ব্যবসায়ীর কিনে দেওয়া। এখানে শিয়ালকে মনে করা হয় দেবতার দূত – তাই বিভিন্ন জায়গায় চাবি এবং ধান মুখে শেয়ালের মূর্তি দেখতে পেলাম। ওপরে কিছুটা সময় কাটিয়ে নিচে নামতে নামতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। কিয়োতো শহরে ফিরে বেশ ভালমত ডিনার করলাম ভাত আর মাংস দিয়ে – আগেরদিনের না খাওয়ার শোধ তোলার একটা ক্ষীণ প্রচেষ্টা।

খেয়ে দেয়ে রাস্তা দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটছিলাম। এমন সময় একটা বড় ধরণের মার্কেট চোখে পড়ল, বসুন্ধরার মত। সেখানে দেখি সিনেমার বিজ্ঞাপন টাঙ্গানো। জাপানে এসে একটা সিনেমা দেখতে পেলে মন্দ হয় না, তাই বেশ খুশী মনে সিনেমা হলের ফ্লোরে উঠে গেলাম। এক সাথে সাত-আটটা সিনেমা চলছে। দুঃখের বিষয় হল সবগুলো পোস্টারই জাপানি ভাষায় লেখা – সে জাপানিজ সিনেমাই হোক আর হলিউডের। তাও আমরা হাল ছাড়লাম না, টিকেট কাটার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের পালা এলে জিজ্ঞেস করলাম যে কোনও সিনেমা ইংরেজিতে চলছে কিনা। এই কথাটা যে টিকিট বিক্রি করছে তাকে বুঝাতে বেশ বেগ পেতে হল, সেও বেশ কিছুটা খুঁজে একটা সিনেমার পোস্টার দেখিয়ে বলল যে এটা ইংরেজিতে চলবে। কিন্তু সে নাম দেখে সিনেমার নাম তো আর বুঝতে পারছি না – সেটাও জাপানিজে লেখা, জিজ্ঞেস করাতে তার ইংরেজি নাম বলতে পারে না – শুধু জাপানিজ নামটাই বলে। অনেক সময়ই তো সিনেমার পোস্টার দেখেই সিনেমার নাম বোঝা যায় – ওটার নাম বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু নায়কের ছবিটা তো বেশ পরিচিত। নায়কের নাম দিয়ে ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই তো মুভির নামটা পাওয়া যাবে। কিন্তু সারাদিন ঘোরাঘুরি করে মাথার ঘিলু একটু নড়ে গিয়েছিল তাই সেই নায়কের নাম পেটে আসলেও মুখে আসছিল না। শেষে গুগলে “contemporary hollywood action actors” দিয়ে সার্চ দিয়ে প্রত্যেকটা নায়কের মুখ দেখতে থাকলাম। অবশেষে আমাদের নায়কের নাম বের হল – “মার্ক ওয়ালবার্গ”। এবার মার্ক ওয়ালবার্গের অভিনীত সমসাময়িক সিনেমা দিয়ে সার্চ! এসব করতে করতেই সিনেমা শুরু হয়ে গেল আর আমারও জাপানি থিয়েটারে বসে সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হল না!

সাতশ সালের দিকে জাপানের রাজধানী ছিল ‘নারা’ – তে। কিয়োতো থেকে বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই শহরটি জাপানের শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির তীর্থভূমি ছিল। এই সময় জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যপক প্রচার ও প্রসার হয়। কিয়োতো থেকে যেহেতু খুব বেশি দূরে না, তাই, শহরটিতে একটা ঢু মারার লোভ সামলাতে পারলাম না। মোটামুটি ঘণ্টা খানেক লাগল ট্রেনে করে পৌঁছাতে। রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করলাম ম্যাপ দেখে। ছিমছাম শহর, হাঁটার জন্য চমৎকার ফুটপাথ আছে। কিছুদূর গিয়ে একটা পার্কে এসে পড়লাম – টোদাজি পার্ক – সেই পার্কের ভেতর অসংখ্য হরিণ চরে বেড়াচ্ছে, কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। পাশেই আবার হরিণের খাওয়ার জন্য বিশেষ রকমের বিস্কিট কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই সেই বিস্কিট কিনে হরিণদেরকে খাওয়াচ্ছেন। পরে জেনেছি যে প্রায় বারশ হরিণ আছে এখানে, আর এই হরিণগুলোকে জাপানের জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। রাস্তার মাঝখানেও বড় করে হরিণের ছবি দেওয়া আছে, গাড়ি সাবধানে চালানোর জন্য সতর্কবাণী, যেকোনো মুহূর্তে হরিণ মহাশয় দুটো লাফ দিয়ে রাস্তার মাঝখানে এসে হাসি দিতে পারে, সময়মত ব্রেক এ চাপ দিতে না পারলে আপনার মুখের হাসি শেষ!

হরিণ দেখে চোখ জুড়িয়ে পার্কের একটু পেছন দিকে আসতেই চোখে পড়ল নারার বিখ্যাত কফুজুকি প্যাগোডা। এটা সেই সাতশ শতাব্দীতে তৈরি। এরকম আরও গোটা চার-পাঁচটা প্যাগোডা দেখতে পেলাম। অনেক দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষজন এগুলো দেখতে এসেছে। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এগুলো অনেক আকর্ষণীয় হলেও, আমি আমার এই স্বল্প জ্ঞান দিয়ে একটার সাথে আরেকটার পার্থক্য বুঝতে পারলাম না। সবই আমার কাছে সুন্দর এবং বড় বড় ‘বিল্ডিং’ হয়েই থাকল।

প্যাগোডাগুলোর ভেতরে না ঢুকে, শহরের অলি গলি দিয়ে হাঁটাটাই ভাল মনে হল। চারদিকে কেমন যেন একটা শান্তি শান্তি ভাব আছে, মনে হচ্ছে, কারও কোন তাড়া নেই। সামনে একটা সুন্দর বাগান দেখে ঢুকে পড়লাম – ইস্যুই-য়েন গার্ডেন। জাপানিজ বাগানগুলো খুবই সুন্দর হয়, একেবারে টিপটপ, সাজানো-গুছানো। বাগানের মাঝখানেই একটা পুকুর আছে। আপনারা যে ভীষণ রকমের প্যাঁচ কষা চাইনিজ অক্ষর দেখতে পান, তাদেরকে কাঞ্জি বলে। পানি বোঝাতে যে কাঞ্জি হরফটা ব্যবহার করা হয়,  পুকুরের আকৃতিটা ঠিক সেরকমের। পুকুরের পানি আসে, বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইয়োসিকি নদী থেকে। বাগান থেকেই পেছনে দাঁড়ানো পাহাড় দেখা যায় – সব মিলিয়ে তিনটা পাহাড় আছে। বাগানের ডিজাইন এমনভাবে করা যেন, বাগানের সবুজ, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোর সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে একটা অসীম দৃশ্যের অবতারণা করতে পারে। বাগানের ভেতরেই ট্র্যাডিশনাল বাসা আছে, যার দরজাগুলো স্লাইডিং ডোরের মত। ওখানে মাটিতে বসে, বিশেষ পাত্রে চা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। বাগানের মাঝ দিয়ে হাঁটার জন্য প্রচুর পাথর পাতা আছে, পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটাকে উৎসাহিত করা হয় যেন পাশের ঘাস-লতাপাতা এবং ফার্ন গাছগুলোর কোন ক্ষতি না হয়।

বাগান দেখে বের হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, পেটে বেশ কিছু ছুঁচো ডন-বৈঠক দিচ্ছিল, কিন্তু খেতে গেলেই তো দিনটা শেষ হয়ে যাবে, এইজন্য সামনের দিকে পা বাড়ালাম। এর পুরস্কার হাতে নাতেই পেয়ে গেলাম কিচ্ছুক্ষণ পর – আরেকটা প্যাগোডার দেখা পেলাম, আপনারা হয়ত ভাবছেন, এ আর এমন কি, সারাদিন ধরে তো প্যাগোডাই দেখছি! কিন্তু এই প্যাগোডাটা মাটি থেকে বেশ কিছুটা ওপরে। সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে মন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারদিকের অনেকটাই দেখতে পেলা, সবুজে সবুজে চোখ জুড়িয়ে গেল। সেখান থেকে বের হয়ে আর না খেয়ে থাকতে পারছিলাম না, কিন্তু বিধি-বাম! দুইটা খাওয়ার দোকান ছিল, বলল যে বন্ধ করে দিচ্ছে, এখন আর খাবার দিবে না। অগত্যা স্টেশনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, যদিও সেটি প্রায় তিন-চার কিলোমিটার দূরে। পথে আরেকটা অনেক বড় মাঠ পেলাম, সেখানেও অনেকগুলো হরিণ নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোন বেড়া নেই, কেউ ওদেরকে জ্বালাচ্ছেও না, শুধু কেউ কেউ বিস্কিট খাওয়াচ্ছে। ততক্ষণে আমাদের অবস্থা এতই কাহিল যে, একবার ভাবলাম হরিণ সেজে হামাগুড়ি দেই, তাহলে হয়ত গোটা দুয়েক বিস্কিট জুটতে পারে কপালে!

পরদিন, কিয়োতো থেকে টোকিও ফেরার পালা। ভাবলাম যে পথেই তো মাউন্ট ফুজি পড়বে, একটু দেখে দু-চোখ জুড়াই। মাউন্ট ফুজি বা ফুজি সান হল, জাপানের সবচেয়ে আইকনিক পাহাড়। পারফেক্ট একটা কোনের মত শ্বেত-শুভ্র ভঙ্গিতে আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে এই পাহাড়টি। জাপানকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া পাঁচটা পোস্টকার্ড দেখে থাকলে এই পাহাড়ের ছবিটি অবশ্যই আপনি দেখে থাকবেন। এহেন পাহাড় দেখার অনেকগুলো উপায় আছে, এর ভেতর একটা হল হাকোনে নামে একটা জায়গায় যাওয়া। হাকোনেতে আবার বুলেট ট্রেনে যাওয়া যায় না। ওদাওয়ারা পর্যন্ত যেয়ে, হাকোনের জন্য আলাদা আরেকটা ট্রেনে উঠতে হয়। ওদাওয়ারাতে যখন নামলাম তখন আকাশে মেঘ আর হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। হাকোনের জন্য টিকিট কাটার কাউন্টারে দাঁড়ানোর পর দেখলাম যে ওখানেই একটা টিভির মনিটর রাখা আছে, যেখানে হাকোনেতে রাখা একটা ক্যামেরা থেকে ছবি তুলে লাইভ দেখানো হচ্ছে। ওখানেই দেখতে পেলাম যে হাকোনেতে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, চারদিক ঘন কাল চাদরে ঢাকা, ওখানে যেয়ে ফুজি সানের দেখা মিলবেনা। এটা বুঝতে পেরেই ওখানে যাওয়ার চিন্তাটা বাতিল করে দিলাম। তার চেয়ে যেখানে এখন আছি, সেই ওদাওয়ারা শহরটাই দেখে ফেলি। একটু হাসিই পাচ্ছিল। এই নামে যে পৃথিবীতে কোন জায়গা আছে সেটাই আবিষ্কার করেছি ঘণ্টা চারেক আগে আর এখন সেটাতে হাঁটার সৌভাগ্যও হতে যাচ্ছে। বাইরে বের হয়ে হাঁটতে লাগলাম। নারার থেকেও শান্ত শহর। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে, একা একাই স্কুল থেকে হেঁটে হেঁটে ফিরছে, সাথে বাবা-মা কেউ নেই! ঢাকার রাস্তায় তো এটা আর এখন চোখেই পরে না! পথের ধারে সুন্দর কিছু লেক, ব্রিজ আর একটা বড় দুর্গ দেখতে পেলাম। পথিমধ্যে একটা দিক নির্দেশক দেখে বুঝলাম যে আমরা সমুদ্রের খুব কাছেই আছি। লোনা হাওয়ার গন্ধ শুঁকে শুঁকে সেই সমুদ্র সৈকতে এসে হাজির হলাম। বাহ! জাপানে সমুদ্র দেখাটাই বাকি ছিল! সেই সৈকতে কোন লোক নেই বললেই চলে, শুধু স্কুল ড্রেস পরে এক জোড়া ছেলে মেয়েকে বসে থাকতে দেখলাম। আর সৈকতে কোন বালি দেখলাম না, দেখলাম ছাই। মনে হয় কোন আগ্নেওগিরি থেকে উড়ে আসা ছাই ঢেকে দিয়েছে জায়গাটাকে, জাপানে আগ্নেয়গিরির কোন অভাব নেই। ওখানে অনেকগুলো পাথর পড়ে থাকতে দেখলাম, যেগুলোর গায়ে কারা যেন সুন্দর সুন্দর নক্সা করে রেখেছে। সীমাহীন সমুদ্রের স্বাদ খুব বেশিক্ষণ নিতে পারলাম না, আবার টোকিও’র ট্রেন ধরতে হবে। তবে সমুদ্রের লোভে যে অতিরিক্ত সময় তার কোল ঘেঁষে ছিলাম তার দণ্ড দিতে হল, বাকিটা পথ দৌড়ে, আর এক মিনিট দেরি হলেই ট্রেনটা ছেড়ে চলে যেত!

টোকিও থেকে ঢাকা ফেরার ফ্লাইট ছিল পরদিন বিকেলে। দেশের বাইরে গিয়ে অল্প একটু সময় পেলেই আমার তৃষ্ণা পেয়ে যায়, দেখা আর ঘোরার তৃষ্ণা। একবার ভেবেছিলাম, অনেক ভোরে উঠে আবার মাউন্ট ফুজিতে যাওয়ার চেষ্টা করব নাকি, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখলাম যে, এতে প্লেন টা মিস হয়ে যেতে পারে। তাই টোকিও এর ভেতরেই আর কোথাও যাওয়া যায় নাকি এটা ভাবতে লাগলাম। শেষে হাজির হলাম – সিনজুকু গোয়েন জাতীয় উদ্যানে। টোকিও তো ভীষণ ব্যস্ত শহর, রাস্তা-ঘাট, বড় বড় বিল্ডিং আর মানুষের পদচারনা চারদিকে, এহেন শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে থাকা এই উদ্যানে ঢোকার সাথে সাথেই মনে হল যেন মুহূর্তের ভেতরেই অন্য একটা জগতে ঢুকে গিয়েছি – যেমন করে অ্যালিস – ওয়ান্ডারল্যান্ডে ঢুকে গিয়েছিল। চারদিকে শুধু সবুজ ঘাস, গাছ, আর লেক। পাখির কলতানে মুখরিত চারদিক। কেউ দল বেঁধে এসেছে পিকনিক করতে, কেউ হাঁটছে, কেউ ঘাসের ওপর বসে বা শুয়ে আছে, আবার কেউ বেঞ্চে বসে বই পড়ছে। এই উদ্যানে তিন ধরণের বাগান আছে – একটা ফ্রেঞ্চ স্টাইলে, একটা ইংলিশ স্টাইলে আর একটা ট্র্যাডিশনাল জাপানিজ স্টাইলে। আমার হাতে খুব বেশি সময় ছিল না, তাই আমি পাগলের মত জোরে জোরে হাঁটছিলাম এই অসীম বাগানে, এই কম সময়েই যতটুকু চোখে এঁটে বুকে রেখে দেওয়া যায় – আর সাথে সাথে আফসোস করছিলাম যে কেন আরও আগে এখানে আসলাম না। চেরি ব্লসমের সময় নাকি এখানে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মাস খানেকের জন্য সেটা মিস করলাম।

জাপান সম্পর্কে তো অনেক কিছুই বললাম, জাপানিজদের সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। এত শান্ত-শিষ্ট, ভদ্র, আর নিখুঁত জাতি আমার আর কোথাও চোখে পড়েনি। ইংরেজিতে কথা বলতে জাপানিজরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিন্তু কোন সাহায্য চাইলে একেবারে জান দিয়ে দেয়, আপনাকে বিপদে পড়তে দেখেছে কিন্তু সাহায্য করবে না, এমনটা হওয়ার নয়। ব্যস্ত ট্রেন স্টেশনে ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে একদিন হাঁটছিলাম, আর জাপানিজরা দৌড়াচ্ছিলেন ট্রেন ধরার জন্য। এমন সময় আমার ক্যামেরার লেন্সের ঢাকনাটা পড়ে গেল। আমি তোলার জন্য নিচু হব, এমন সময় একটা মেয়ে চিলের মত এসে ছোঁ মেরে ওটি কুড়িয়ে আমার হাতে দিয়ে গেল। কত জায়গায় গেলাম, কোথাও কোন ধরণের সিকিউরিটি চেকিং নেই, কোথাও কোন মেটাল ডিটেক্টর নেই, সবাই মনে হয় সবাইকে বিশ্বাস করছে, কেউ যে কারও ক্ষতি করতে পারে এটা মনে হয় ওদের মাথাতেই নেই। কেউ কারও ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে না, সবাই নিজেদের গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ – কিন্তু কারও কোন সাহায্য লাগবে কিনা এটা ঠিকই খেয়াল করছে। যখনই কোন দোকানে ঢুকেছি, কোন কিছু দরকার হয়েছে, এমন ভাবে সাহায্য পেয়েছি যেন আমি একজন মহান ও গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় সবসময় বিদায় সম্ভাষণ কানে এসেছে, কখনো কখনো পুরো ব্যাপারটাই গায়েবি মনে হয়েছে – কোথা থেকে কে কথা বলে উঠল? যেখানেই বাংলাদেশের নাম বলেছি, সেখানেই আমার দেশকে চিনতে পেরেছে। রাস্তা-ঘাট এত পরিষ্কার, এয়ারপোর্টে তো কণামাত্র ধুলোও নেই। এহেন এয়ারপোর্টের কর্মচারীও কিন্তু বসে নেই, মুছেই যাচ্ছে, মুছেই যাচ্ছে, আমার মনে হয়েছে যে কি মুছছে, কেন মুছছে! কোন ময়লাই তো নেই – ওরা কিন্তু তা মনে করছে না – বিরামহীন ভাবে তার কাজ করে যাচ্ছে। এগারটা সাতান্ন মানে, এগারোটা সাতান্নই, এক সেকেন্ডও এদিক সেদিক হবে না, ট্রেন অথবা বাসটা ঠিকই এসে আবার চলে যাবে।

জাপানিজ মানুষজন আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছে, যে আমি সম্ভব হলে ছোট থাকতে থাকতেই, আমার ছেলেমেয়েদেরকে একবার ওখানে পাঠাতাম – ভদ্রতা, নম্রতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, পরিচ্ছন্নতা আর মূল্যবোধের শিক্ষা নেওয়ার জন্য – আমার জন্য তো অনেক দেরি হয়ে গেল, যদি আমার পরবর্তী প্রজন্ম ওদের কাছ থেকে এই ভালজিনিস গুলো থেকে কিছুটা হলেও নিতে পারে। জাপান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিমান ছাড়ার আগ মুহূর্তে, জাপানিজদের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে দুইটা শব্দ আনমনেই আমার মুখ থেকে বেড়িয়ে আসল – যেই শব্দজুগল সব জায়গাতেই এ  কয়দিন ওরা আমাকে শুনিয়েছে, ছায়া সঙ্গীর মত যে শব্দ দুটো আমাকে ঘিরে ছিল – “আরিগাতো গোজাইমাস” – “অসংখ্য ধন্যবাদ” – “Thank you very much”!

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT