ওলন্দাজদের শহরে | A walk in the world

ওলন্দাজদের শহরে

What is your dream destination?

ওলন্দাজদের শহরে

enter site ষোলশ শতাব্দীর ঘটনা।

can i buy Pregabalin online মার্কো পোলোর কল্যাণে ততদিনে পশ্চিমারা বুঝে গিয়েছেন যে পূর্বের দিকে ধন-সম্পদের কোনও শেষ নেই। ভারতবর্ষ থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মসলা, ফসল আর নীলের হাতছানি। ওখানে কোনও মতে পৌঁছাতে পারলেই হয়, ‘নেটিভদের’ ঠেঙ্গিয়ে বড়লোক হওয়া শুধু সময়ের ব্যপার। সমস্যা বাঁধল অন্য জায়গায়। তখনকার দিনে তো আর এ যুগের মত উড়োজাহাজ ছিলনা যে উঠলাম আর পৌঁছে গেলাম এক দিনের ভেতরে। জাহাজ ভাসিয়ে পাড়ি দিতে হত উত্তাল সমুদ্র। ইউরোপ থেকে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাস ছয়েক লেগে যেত ভারতের মত কোনও দেশে পৌঁছাতে। এই ছয় মাসের যাত্রা পথ ছিল ভীষণ কঠিন। ঝড় আসত কোনও ধরণের নিয়ম না মেনেই, জ্বর-জ্বারি সহ বিভিন্ন ধরনের অসুখ বিসুখে নাবিকরা মারা যেত। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জলদস্যুরা, হা রে রে রে করে তেড়ে এসে সবকিছু কেড়ে নিয়ে যেত তারা। সেজন্য, এই অভিযাত্রা ছিল অনেকটা জুয়া খেলার মত – আপনি যদি পূর্ব এশিয়ার কোনও দেশে এসে, লুটপাট অথবা ব্যবসা করে জিনিসপত্র নিয়ে আবার নিজের দেশে ফিরে যেতে পারেন তাহলে আপনি বিশাল বড়লোক হয়ে যাবেন। আর না পারলে, পথের ফকির। এইজন্য ধুরন্ধর ওলন্দাজরা বুদ্ধি বের করল। তারা একটা কোম্পানি তৈরি করার পরিকল্পনা করল, যে কেউ চাইলেই টাকার বিনিময়ে কোম্পানির আংশিক মালিক হতে পারবেন, হয়ে যেতে পারবেন কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার।  আবার চাইলে এই মালিকানা আরেকজনের কাছে বাজারে বিক্রিও করে দিতে পারবেন। প্রবর্তন হল পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ধারণা  – পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি তৈরি হল – “ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি”। পরবর্তী তিনশ বছর ধরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এশিয়াতে পাঠাল চার হাজার সাতশ পঁচাশিটি জাহাজ, লাখে লাখে ইউরোপিয়ানরা এশিয়াতে ঢুকে পড়ল। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজধানী হল একটা পোর্ট সিটি –  জায়াকার্তা, যার নাম তাড়ার পরিবর্তন করে রাখল বাটাভিয়া। কালের বিবর্তনে সেটা এখন জাকার্তা, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী।

click

follow site আমি এই মুহূর্তে সেই ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সাথে গাইড হিসেবে আছেন এক প্রাণবন্ত ডাচ তরুণ, মার্ক। সাথে আমার মত গোটা বিশেক বিভিন্ন দেশের ছেলে মেয়েদের সাথে অ্যামস্টারডামের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছি আমরা। মার্ক মনে করে যে, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই সারা পৃথিবী শাসন করার কথা ছিল। কিন্তু এক জেনারেশন পরেই, সবাই আত্মতুষ্টিতে ভোগা শুরু করে। আরাম, আয়েশ আর উপভোগের নেশায় সবাই গা ভাসিয়ে দেয়। ফলে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে অনেক জায়গার ক্ষমতা চলে যায়। এটা নাকি, এখনকার দিনের ইউরোপিয়ান তরুণদের জন্য একধরনের শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে। এশিয়ান ছেলে-মেয়েরা এখন অনেক বেশি পরিশ্রম করে যাচ্ছে পশ্চিমাদের তুলনায়। যদি ইউরোপিয়ানরা আরও পরিশ্রম না করে তাহলে হয়ত ইউরোপিয়ানদের অথবা আমেরিকানদের স্বর্ণযুগও শেষ হয়ে আসবে।

go আমার এই গাইডেড ট্যুরটি শুরু হয়েছিল আরও ঘণ্টা খানেক আগে। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী অ্যামস্টারডামে এর আগেও অনেকবার এসেছি, কিন্তু খুব বেশি ঘুরে দেখার সময় পাইনি। এবার হাতে কিছু সময় থাকাতে ইন্টারনেটে ঘাটতে ঘাটতে একটা ফ্রি ওয়াকিং ট্যুরের ওয়েবসাইট পেয়েই সাথে সাথে রেজিস্টার করে ফেললাম। ট্যুরটাতে ফ্রিতে রেজিট্রার করার সুযোগ থাকলেও ট্যুর শেষে, গাইডকে খুশী হয়ে কিছু টাকা দিতে হয়। হিসাব করে দেখলাম এর পরিমাণও একদম কম না। যাইহোক, সকাল আটটার আগে ড্যাম স্কয়ারে চলে আসলাম।  ড্যাম স্কয়ারকে অ্যামস্টারডামের প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে। সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে অল্প কিছুদূর হাঁটলেই এখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। নেদারল্যান্ডসের সাথে কয়েকটা ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে খুব মিল আছে। বাংলাদেশের মত নেদারল্যান্ডসও বন্যাপ্রবণ দেশ। এর কারন হল, নেদারল্যান্ডসের বেশির ভাগ অঞ্চলের অবস্থানই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে। এইজন্যই দেশটার নাম নেদারল্যান্ডস – মানে low land – নিচু জায়গা। নেদারল্যান্ডসের পানির পরিমাণ যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ, কোরিয়া আর তাইওয়ানের পরেই এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশের মতই বন্যা এসে এই দেশটিকে আঘাত হেনেছে বারবার। পার্থক্য হল, এই বন্যা থেকে বাঁচার জন্য, ওরা একের পড় এক বাঁধ দিয়েছে। আমস্টারডাম শহরের চারদিকেই বাঁধ দিয়ে দেওয়া। আর আছে বিখ্যাত ক্যানাল রিং। অসংখ্য ক্যানাল(বাংলায় যাকে আমরা খাল বলি) শিরা-উপশিরার মত ঘিরে আছে শহরটাকে – কিছু ছোট ক্যানাল আর কিছু বড় – যাদেরকে গ্র্যান্ড ক্যানাল বলে। ভেনিসের থেকেও অ্যামস্টারডামের ক্যানালের সংখ্যা বেশি।

site de rencontre pour ado en belgique

source site হাঁটা শুরু করার আগে সবাইকে তার পরিচয় দিতে হল। পরিচয়পর্বটাও বেশ মজার। এক একটা মহাদেশের নাম ডাকা হল – তখন সেই মহাদেশের সবাই হাত তুলল। এরপর নিজের নাম আর দেশের নাম বলতে হল। প্রত্যেকটা নাম বলার পরই সবাই হইহই করে চিৎকার করে উঠছিল উৎসাহ দেওয়ার জন্য। এরপর সবাই জোড়ায় জোড়ায় ভাগ হয়ে গেলাম মিনিট পাঁচেকের জন্য। আমি আমার জোড়াকে আমার একটা প্রিয় জায়গার নাম বললাম, সেও বলল। এমনসময় হই হই করতে করতে কিছু অল্প বয়সী ছেলে মেয়ে এসে হাজির হল। ওদের কাছে অনেক পুরনো জিনিস আছে। আমাদের কাছ থেকে যেকোনো একটা জিনিস ওরা নিতে চায়, বিনিময়ে ওদের যেকোনও একটা জিনিসও ওরা দিয়ে দিবে। খুবই ছোটখাট জিনিস। একজন পকেট থেকে একটা চিরুনি বের করে একটা মাথার ক্লিপ নিল। এরকম ছোটখাট মজা কিন্তু পুরো শহর জুড়েই চলছে। এইজন্যই অ্যামস্টারডাম আমার খুব পছন্দ হয়েছে। পুরো শহরটাই যেন তরুণ-তরুণী আর যুবক-যুবতীতে ভরপুর। প্রাণ-প্রাচুর্যে টগবগ করে ফুটছে যেন পুরো শহর, হইহই করতে করতে জীবনটাকে সবাই উপভোগ করছে।

flirten körperkontakt এরকম ছোট – বড় ক্যানালের মাঝখান দিয়ে গল্প করতে করতে চলতে থাকে আমাদের হাঁটাহাঁটি। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসে হাজির হই একটা বিশেষ জায়গায়। অ্যামস্টারডাম সমুদ্রের পাশে হওয়াতে, দেশ বিদেশ থেকে জাহাজ এসে একসময়য় নোঙ্গর ভেড়াত এখানে। জাহাজ থেকে নেমে আসত নাবিকেরা। আর পৃথিবীর আদিমতম পেশার মেয়েরা লাল রঙের লন্ঠনবাতি নিয়ে অনেকদিন পানিতে থাকা বুভুক্ষু নাবিকদের পথ দেখাত। সেই লাল রঙের লন্ঠন থেকে লাল জানালা’ওলা ঘর হয়ে এখন তৈরি হয়েছে রেড লাইট ডিসট্রিক্ট। যেখানে প্রস্টিটিউশন বৈধ করা হয়েছে। রাস্তার পাশে রঙ চড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে নানা বয়সের, নানা দেশের, নানা রঙের, নানা রকমের মানুষ। আছে জাদুঘর, আর অসংখ্য ক্যাফে। সব কিছু দেখে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। বুকের ভেতর ধাক্কা খেলাম যখন দেখলাম, দোকানের শো-কেসেও জীবন্ত মানুষ বিক্রি হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সেজে গুঁজে – কোনও ম্যানিকুইন না – আমার মতই রক্ত মাংসের মানুষ! সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই চমকে গেলাম গির্জার ঘণ্টার শব্দে। নাবিকেরা মেয়েদের দেখানো পথে হেঁটে যেয়ে ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ করার পরে অনুশোচনায় ভুগত। তাদের সেই অনুশোচনায় মলম বোলানোর জন্যই ছিল এই গির্জা। এক দরজা দিয়ে বের হয়ে আরেক দরজা দিয়ে ঢুকলেই পাপ মোচনের ব্যবস্থা!

How To Get Cytotec Prescription in Fort Collins Colorado অ্যামস্টারডামের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম এক কথায় বলতে অসাধারণ। মেট্রো ট্রেন, ইন্টারসিটি ট্রেন, স্বল্পগতির ট্রাম, বাসের সাথে ফেরিও আছে। জিভিবি নামের একটা প্রতিষ্ঠান এই পাবলিক সিস্টেমের দায়িত্বে আছে। ওদের একটা কার্ড সাথে থাকলে আর কোনও চিন্তা নেই, শুধু মাঝে মাঝে কিছু টাকা ভরে নিতে হবে। এই কার্ড সাথে নিয়ে যেকোন একটা যানবাহনে উঠে পড়া যায়। ওঠার আগে কার্ডটা একটা মেশিনে ছোঁয়াতে হবে, আবার নামার আগেও। নামার আগে কার্ড না ছোঁয়ালে অনেক টাকা গচ্চা দিতে হবে – কারন তখন, সেই রুটের সর্বোচ্চ দূরত্বের ভাড়াই আপনার কাছ থেকে কেটে নিবে। আর আপনি যদি কার্ডটি যন্ত্রে না ছুঁইয়ে ওঠেন? তাহলে অবশ্য বিনা পয়সাতেই ভ্রমণের সুখ নিতে পারবেন। তবে, মাঝে মাঝেই একটা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র নিয়ে টিকেট চেকার ওঠে। তারা যাত্রীদের কার্ড নিয়ে তাদের হাতে থাকা একটা যন্ত্রে ছোঁয়ায়। আপনি যদি, চুরি করে ওঠেন তাহলে, যন্ত্রটি সেটা ধরে ফেলবে আর আপনাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে। এত পাবলিক পরিবহণের মাঝখানেও অ্যামস্টারডামের ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে বাই-সাইকেল। যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই দেখবেন সবাই সাইকেল চালিয়ে তাদের গন্তব্যে যাচ্ছে। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা – যাকে বলে আবালবৃদ্ধবনিতা কেউই বাদ নেই। দুই-তিন বছরের বাচ্চাদের সাইকেলের পেছনে বসানোর জন্য বিশেষ আসন পাওয়া যায়। বাবা-মায়েরা সেখানে বাচ্চাদের বসিয়েই কাজে যাচ্ছে। আর সাইকেলের জন্য আলাদা বিশেষ লেন আছে। এসমস্ত সাইকেলের গতিও প্রচণ্ড। ঢাকায় আমি যেমন কয়েকবার গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছি, তেমনি অ্যামস্টারডামে সাইকেলের নিচে চাপা পড়ার হাত থেকে সৌভাগ্যভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছি। সাইকেলগুলো পার্ক করার জন্য গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। কয়েক তালা সুবিশাল গ্যারেজে শুধু সাইকেলই পার্ক করে রাখা। আপনার নিজের সাইকেল না থাকলেও চিন্তা নেই। বিভিন্য জায়গায় সাইকেল ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিছু ইউরো মেশিনে ঢোকালে, সাইকেল আনলক হয়ে যায়। সাইকেল চালান শেষে আবার নির্দিষ্ট জায়গায় ফেরত দিয়ে দিলেই হয়। ট্রেন অথবা ট্রামেও সাইকেল নিয়ে উঠে পড়া যায়, সাইকেল রাখার আলাদা জায়গা ওখানেও আছে। এমনকি একটা জাদুঘরও আছে যেখানে সাইকেলে করে ঘুরে বেড়ান যায়। আট লাখ লোকের শহর অ্যামস্টারডামে প্রায় নয় লাখ সাইকেল আছে। এর ভেতর নাকি এক লাখ সাইকেল প্রতি বছর চুরি হয়, আর ক্যানেলের পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় পনের হাজারের উপর!

follow url

source অ্যামস্টারডাম যেমন সাইকেলের জন্য বিখ্যাত, তেমনই বিখ্যাত তার কফি শপগুলোর জন্য – এই কফি শপগুলোতে খাবার-দাবার, কফির সাথে মারিজুয়ানাও লিগালি বিক্রি করা হয়। মারিজুয়ানা বিক্রি করতে পারলেও, ওরা কিন্তু মদ বিক্রি করতে পারেনা। এই কফিশপগুলোর টানেই অনেক তরুণ-তরুণী অ্যামস্টারডামে ছুটে আসে যা ড্রাগ ট্যুরিজম নামে পরিচিত। ২০০৮ সালে নিয়ম করে কোনও বিদ্যালয়ের ২৫০ মিটার রেডিয়াসের ভেতরে থাকা সব কফিশপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আপনি যদি শুধুমাত্র কফি খেতে চান যেখানে মারিজুয়ানার উপদ্রব থাকবে না, তাহলে কফিশপের বদলে আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে ক্যাফে অথবা বার।

source site ওলন্দাজরা জাতি হিসেবে খুবই আমুদে, উদার আর খোলামেলা। পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহরেও সমকামীদেরকে গ্রহণ করা হয়নি, অ্যামস্টারডাম এর ব্যতিক্রম, ওড়া নিয়ম করে ২০০১ সালে সমকামীদের বিয়ের বৈধতা দেয় (এটা ভাল না খারাপ এই তর্কে যাচ্ছি না)। নেদারল্যান্ডসে কিন্ডারগার্টেন থেকেই সেক্সুয়ালিটির শিক্ষা দেওয়া হয়, এসব ব্যপারে ওড়া বাচ্চাদের কাছ থেকে কোনও কিছুই লুকাতে চায় না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এইসব কোর্সের ডিজাইন করা হয়। এই ব্যপারটা এমন যে মানুষ এক দিন না এক দিন শিখবেই, কিন্তু কী শিখবে আর কার কাছ থেকে শিখবে এটাকে ওরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।  তাই, ওরা কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না। ওরা চায় যে এগুলো যেন প্রিয় শিক্ষকদের কাছ থেকে খুব ভাল মত বাচ্চারা জানতে পারে। শহরেই নিমো জাদুঘরে গেলেই এ সংক্রান্ত শিক্ষার অনেক নিদর্শন দেখতে পাবেন। এসব কারনে নেদারল্যান্ডসে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ভেতর প্রেগনেন্সির হার পৃথিবীতে সবথেকে কম। এগুলো যখন শুনছিলাম তখন বেশ খারাপ লাগছিল, পরে চিন্তা করে দেখলাম যে ওরাই হয়ত সঠিক কাজটাই করছে!

মানুষ তার আসে পাশের সাপেক্ষে ভাল থাকলেই খুশী থাকে। যেমন, আমার স্কুলের সবচেয়ে ভাল ছেলেটার চেয়ে যদি আমি রেজাল্ট ভাল করতে পারি তাহলেই খুশী। তেমনি উচ্চতার ক্ষেত্রেও। আমার উচ্চতা পাঁচ ফিট আট ইঞ্চির কিছু উপরে। বাংলাদেশের তুলনায় খুব বেশি খারাপ না। আমার আসে পাশে আমার থেকে লম্বা ছেলে খুব বেশি একটা দেখি না। এতেই আমি খুশী হয়ে গর্বে মাটি থেকে দু’ইঞ্চি উপর দিয়ে হাঁঠতাম। সেই আমি নেদারল্যান্ডসে যেয়ে লিলিপুটের থেকেও ছোট হয়ে গেলাম। ছেলেগুলোর দিকে তাকাতে তো ঘাড় ভেঙ্গে যাওয়ার দশা, অনেক মেয়েও আমার থেকে লম্বা। পরে জেনেছি, ওলন্দাজ ছেলেদের গড় উচ্চতা ছয় ফিট এক ইঞ্চি। আর অ্যামস্টারডামে কিন্তু ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি!

অ্যামস্টারডামের বাড়িগুলোর দিকে ভালমত তাকালে বোঝা যায় যে অনেকগুলোই একটু হেলে আছে। হেলে যাওয়া এই বাড়িগুলোকে আদর করে ড্যান্সিং হাউজ নামে ডাকা হয়। আসলে পুরো শহরটাই জলাভূমির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। এইজন্য বাড়িগুলো করার আগে অসংখ্য কাঠের তৈরি পোল পাতা হয়। সেই কাঠের পোলের ওপরই বাড়ি গুলো দাঁড়িয়ে। এই কাঠগুলো বেশিরভাগই সুদূর নরওয়ে থেকে আনা। এই পোলগুল একসময় বেঁকে যায়, আর বাড়িগুলোও হেলে পড়ে। এখন অবশ্য যেসব বাসার পোলগুলো পচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ওইগুলো কংক্রিট দিয়ে পরিবর্তন করা হচ্ছে। জায়গার অভাবে, বাড়িগুলো কিন্তু খুবই সরু। এইজন্য সিঁড়িগুলোর জন্য কোনও জায়গা নেই বললেই চলে। তাই, মালপত্র সিঁড়ি দিয়ে তোলাটা প্রায় অসম্ভব। এইজন্য জানালাগুলো অনেক বড় আর জানালাগুলোর উপরে হুক দেখা যায়।  আসবাবপত্র সব জানালা দিয়েই দড়ির সাহায্যে বাড়ির ভেতরে ঢোকে।

পৃথিবীর সবচাইতে ভদ্র পুলিশ মনে হয় নেদারল্যান্ডেসই আছে। ওলন্দাজরা তাদের পুলিশ নিয়ে যেমন গর্বিত তেমনি আবার বিরক্তও। এত সফটনেস নাকি পুলিশদের ভেতর মানায় না। কোনও পুলিশ নিয়োগ দেওয়ার আগে মাসের পর মাস তাদেরকে অবসার্ভ করা হয় আর নেওয়া হয় অসংখ্য সাইকোলজিক্যাল টেস্ট। এই সমস্ত পরীক্ষায় যদি পরীক্ষকরা বিন্দুমাত্রও টের পান যে কারও ভেতর প্রতিশোধপরায়ণতার মনোভাব আছে তাহলে সে যত ভালই পারফর্ম করুক না কেন সরাসরি বাদ পড়ে যায়। কোনও পুলিশ যদি কখনও কোনও মানুষের সাথে ভায়োলেন্ট হন তাহলে তাকে সেই কাজের জন্য কৈফিয়ত দিতে হয়। পুলিশদের প্রতি কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। সমাধান না হলে সতর্ক করে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই আলোচনার পেছনে পুলিশ এত বেশি সময় দেয় যে অনেক সময় অপরাধীরাই বিরক্ত হয়ে পিছু হটে। আর, নেদারল্যান্ডসের অনেক জেলখানা প্রতিবছর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে  শুধুমাত্র কয়েদির অভাবে।

পৃথিবীতে যত ফুলের মূল(flower bulbs) আছে তার আশি শতাংশই আসে নেদারল্যান্ডস থেকে। এর ভেতর বেশিরভাগই টিউলিপ। সেই ছোটবেলায় আলেকজান্ডার দ্যুমোর ব্ল্যাক টিউলিপ বইটা পড়ে, টিউলিপ এর প্রতি এক অন্য রকমের আগ্রহ জন্মেছিল। অ্যামস্টারডামে যেয়ে সেই টিউলিপ দেখে চোখ জুড়ালাম। কত রকমের রং-বেরঙের টিউলিপ যে আছে। রঙের সাথে আছে মন ভুলিয়ে দেওয়া গন্ধ। মনে হচ্ছিল, সবগুলো একসাথে বাসায় নিয়ে আসি। এই ফুলের দোকান যদি ভালমত দেখতে চান তাহলে পুরো এক দিনেও পারবেন কিনা সন্দেহ! অসংখ্য ধরনের ফুল যেমন আছে, তেমনি অসংখ্য ধরনের আছে পনির(Cheese)। একটা মস্ত দোকানের পুরোটুকুই বিভিন্য আকৃতি আর রঙের পনির দিয়ে সাজানো। আপনি যদি একটা পনির দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে এটা কেমন, সাথে সাথে আপনাকে একটু কেটে খেতে দিবে। আমি মনে হয় একটা পনির কিনতে যেয়ে দশ রকমের পনির চেখে ফেলেছিলাম। কোনটা বাদ দিয়ে কোনটা নিব এটা ঠিক করতেই পাগল হওয়ার দশা। সকালের নাস্তাই হোক অথবা দুপুর কিংবা রাতের খাবার – ওলন্দাজদের একটু হলেও পনির চাই। ওহ, ওদের সবচাইতে জনপ্রিয় পনিরের নাম ‘গৌডা’ – নেদারল্যান্ডসে গেলে এটা খেতে ভুলবেন না কিন্তু!

এখন তো কম্পিউটারের যুগ, আমাদের সব তথ্য কম্পিউটারের ভেতরেই থাকে। কিন্তু এই কম্পিউটার আসার অনেক আগেই ওলন্দাজরা তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যপারে পারদর্শী ছিল। আমি সেই ১৯৪০ সালের দিকের কথা বলছি – তখনই তাদের বেশিরভাগ নাগরিকের তথ্য অথরিটির কাছে ছিল। কে কোথায় থাকে, কি করে, এই সবকিছুই। এই অসাধারণ জিনিসটার অনেক কড়া মূল্য দিতে হয়েছিল ডাচদেরকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা খুব সহজেই এই তথ্যভাণ্ডার দেখে ইহুদিদেরকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলতে সক্ষম হয়। এসব ঘটনা শুনছিলাম আনা ফ্র্যাঙ্কের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। ১৯৪৩ সালে তেরতম জন্মদিনে ছোট্ট আনা বাবার কাছ থেকে একটা ডায়েরি উপহার পায়। ডায়েরিটাকে আদর করে সে ডাকত কিটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি এই মেয়েটি একটা বাসায় আটকে পড়ে। তার নিঃসঙ্গতার আর বিভীষিকার কাহিনী সে লিখে রাখে এই ডায়েরিতে। পরবর্তীকালে এই ডায়েরিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ডায়েরি – “আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি”। অন্ধকার পাতাল ঘরে দমবন্ধ অবস্থায় বসে থাকতে থাকতে আনা সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে আসা গির্জার ধ্বনি শুনে সে বুঝতে পারত কয়টা বাজে। আনা ফ্রাঙ্কের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টা বেজে উঠল – আমি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগুলাম।

বিকেল গড়াতেই একটা নৌকাতে উঠে পড়লাম – অ্যামস্টারডামের বিখ্যাত ক্যানেল দিয়ে বেড়ানোর জন্য। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে একশ পঁয়ষট্টিটা ক্যানেল আছে এই শহরে আর আছে তেরশ ব্রিজ। এই ক্যানেলের উপর আড়াই হাজারের ওপর হাউজবোট রয়েছে, বাসাগুলো নৌকার মত ভেসে আছে পানির উপর। এই হাউজবোটগুলোর বেশিরভাগেই মানুষ থাকে, অল্প কিছু ট্যুরিস্টদের জন্য ভাড়াও দেওয়া হয়। নৌকায় করে যেতে যেতে কত রকমের জিনিস যে দেখলাম। শহরটা রাস্তায় হাঁটার সময় এক রকম লাগে আর, নৌকাতে করে ঘোরার সময় আরেকরকম। ছোট এক নৌকায় করে ভিক্ষা করতে দেখলাম ঝলমলে পোশাক পরা এক ভদ্রলোককে। হাতে ঘুরান পেডাল দিয়ে নৌকা চালাচ্ছে আর সাথে খুব সুন্দর একটা ইন্সট্রুমেন্ট বাজাচ্ছে। সুরের মায়াবীয় মূর্ছনায় চারদিক ভরিয়ে তুলছে। সেই সময়টাই ছিল গোধূলি লগ্ন, সূর্য তার তেজ হারিয়ে সোনারঙ্গা হলুদ রঙে ভেঙ্গে চুরে লুটিয়ে পড়ছে পানির ভেতর। সুরের সাথে পানিতে ভাসা রঙ – এমন মায়াবী মুহূর্তের জন্যই মানুষ মনে হয় হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকতে চায়।

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT