ভিউ কার্ডের দেশে পদার্পণ

What is your dream destination?

ভিউ কার্ডের দেশে পদার্পণ

ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়াতেই, সবুজ পাসপোর্ট দেখে, একজন সাহায্যকারী, পাশের একটা লাইন দেখিয়ে, ওখানে দাঁড়াতে বলল। দেখলাম, যে ওটা ওয়ার্ক ভিসার লাইন। যখন বললাম যে আমি পর্যটক, তখন তাদের চোখ রীতিমত কপালে উঠল। যখন বুঝল যে আমি একা আর সঙ্গী একটা ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই না, তখন ইমিগ্রেশন অফিসার পাশে মুখ ফিরিয়ে কি যেন বলল। সাথে সাথে ছুটে আসল আরও দুজন। সবাই একবার করে পাসপোর্টের পাতা একটা একটা করে উল্টাতে লাগল। যুগপৎ ভাবে শুরু হল জেরা। কি করি, কেন এসেছি, কবে যাব, কোথায় যাব, কত টাকা আছে, হোটেল বুকিং কোথায়, আরও কত কি।

অবশেষে আমার পাসপোর্টে একটা পুরাতন সিঙ্গাপুরের ভিসা দেখতে পেয়ে একজন নতুন কিছু আবিষ্কারের খুশীতে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। নিজেদের ভেতর কি যেন আলাপ করে দুজন নিজেদের ডেস্কে চলে গেল। আর আমার মিলল মুক্তি।

মুক্তির আনন্দ যে কিছুটা ছিল না তা নয়, কিন্তু মুখটা তো তেঁতো হয়ে গেল, দেশটাতে ঢোকার আগেই!সেই তেঁতো মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যেতে সময় লাগলো সর্বসাকুল্যে মাত্র পাঁচ মিনিট।

ইমিগ্রেশন পার হতেই, মানি এক্সচেঞ্জের দোকান, ৪ মিনিট গেল সেখানে। সেখান থেকে ১ মিনিট হাঁটলেই, বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসলাম – পা দিলাম নতুন আরেকটা দেশের মাটিতে। পা যদিও মাটিতেই দিতে হল, কিন্তু চারদিকে মাটির দেখা মেলা ভার।

চোখ তুলে তাকাতেই সুনীল জলরাশি চোখ ধাধিয়ে দিল। আমি মিনিট পাঁচেক শুধু দাঁড়িয়েই থাকলাম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। ঠিক তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমি এই দেশটির বুকে দাঁড়িয়ে আছি – যে দেশটির ছবি দেখলেই মনে হত কল্পনার কোনও দেশ, ধরা ছোঁয়ার বাইরের কোনও স্থান!

সারাদিনই হয়তো ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম, কিন্তু তাতে ছেদ টানল প্রচণ্ড গরম। ডিসেম্বরেও সূর্যদেব অগ্নিশর্মা, বুঝতে পারলাম যে দরদর করে ঘামছি আর প্রচণ্ড পানির পিপাসা পাচ্ছে। আমাকে হোটেল থেকে বলেছিল যে গাড়িতে বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করবে, কিন্তু এরজন্য যে ১৫ ডলার চেয়েছিল সেটা আমি দিতে চাইনি, এজন্য ওদের বলে দিয়েছিলাম যে আমি নতুন দেশে আসলে হেঁটে বেড়াতেই পছন্দ করি।

কিন্তু গোলমাল বাঁধল অন্য জায়গায়। আমি জানতাম যে একটা পাবলিক বাস আছে হুলহুমালে দ্বীপে যাওয়ার, একটা বাস চলে যেতেও দেখলাম, কিন্তু কোথা থেকে উঠতে হবে সেটা বুঝতে পারলাম না। একটা বাস চলে গেলে পরের বাস আধা ঘণ্টা পর আসে। কত লোককে জিজ্ঞেস করলাম, কেউই বলতে পারেনা। সব যাত্রীদের জন্যই কেউ না কেউ হোটেল থেকে এসেছে, প্রাইভেট বোটে করে নিয়ে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে, আমার চোখের সামনে দিয়েই, আর আমি একলা বাস খুঁজে বেড়াচ্ছি। এভাবেই পরের বাসটাও চলে গেল আর আমি গরমে সেদ্ধ হতে থাকলাম। একসময় মনে হল যে, এখানেই মনে হয় কাটিয়ে দিতে হবে সারাদিন।

অবশেষে কিভাবে কিভাবে যেন বাস ছাড়ার জায়গা খুঁজে পেলাম আর একটা বাস আসতে দেখলাম। সাথে সাথে আমি রীতিমত বাসের সামনে দাঁড়িয়ে বাস থামিয়ে উঠে পড়লাম। বাসের চালক একবার বলার চেষ্টা করল যে বাসটা কেবল এসে পৌঁছাল, লোকজনদের নামার সুযোগ করে দিতে হবে, তারপর আবার বাস ছাড়বে। সেই কথায় কান দেওয়ার মত অবস্থায় আমি ছিলাম না, পুরো ৯০ মিনিট দাঁড়িয়ে খুঁজে পেয়েছি, যে, গ্যাঁট হয়ে যেয়ে বসলাম জানালার ধারে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ছাড়ল, চারদিকের অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম হোটেলের কাছে। ম্যাপ দেখে হোটেল খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হল না।

হোটেলে ঢোকার আগেই, একটা দোকান থেকে বড় এক বোতল পানি কিনে ঢকঢক করে এক চুমুকে প্রায় সবটাই শেষ করে ফেললাম। হোটেলের রুমে ঢুকে বুঝলাম যে, শরীরে লবণাক্ত ঘামের সাথে, জুতার ভেতর করে নিয়ে এসেছি অনেক বালি। গোসল করে তার কিছুটা দূর করার চেষ্টা করলাম, যদিও আবার শরীর ভিজে যেতেও খুব একটা সময় লাগলো না।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে বের করলাম পাবলিক ফেরি ছাড়ার জায়গা। এমন একটা দেশ, যেই দেশে বাস চলার খুব একটা সুযোগ নেই, একটা অথবা দুইটা বাস ১ থেকে ২ কিলোমিটার দূরত্বে চলছে। তাও শুধু বাসা থেকে ফেরি ঘাট পর্যন্তই আসল গন্তব্য। সম্বল শুধু পাবলিক ফেরি, আর প্রাইভেট বোট।

সেরকম একটা ফেরির টিকেট কেটে অপেক্ষা করতে লাগলাম। দেখতে দেখতে একটা ফেরি এসে হাজির হল।

ফেরি থামার সাথে সাথেই লোকগুলো নামার সুযোগ পেল কি পেল না, সাথে সাথেই সবাই হুড়মুড় করে ওঠা শুরু করে দিল, আমিও তাদের সঙ্গী হলাম। দোতালায়, একটা জায়গা খুঁজে, জানালার কিনারে বেঞ্চের উপর বসে পড়লাম।

শুরু হোল আমার সংক্ষিপ্ত মালদ্বীপ সফর, যে দেশটি হয়ত আর কয়েক যুগ পর পৃথিবীর মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে, মানুষের খামখেয়ালির জন্য।

ছবিটি তুলেছিলাম ২০১৫ এর ডিসেম্বরে, মালদ্বীপের কোনও এক পাবলিক ফেরিতে বসে।

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT