নোবেল জয়ীর সাইকেল

What is your dream destination?

নোবেল জয়ীর সাইকেল

বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে জন্ম লোকটার, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে তার নাম রেখেছিলেন, আজ থেকে ৮৩ বছর আগে, ১৯৩৩ সালে।

ঢাকার সেইন্ট গ্রেগরি বিদ্যালয় দিয়ে যার পড়াশুনার হাতেখড়ি সেই তিনিই কালক্রমে, শান্তিনিকেতনের পথ ভবন, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের পথ মাড়ালেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ই তার মুখগহ্বরে কর্কট রোগ বাসা বাঁধে। সে প্রায় ৬৮ বছর আগের ঘটনা। ডাক্তাররা বলে দিলেন ১৫ শতাংশ বাঁচার সম্ভাবনা আছে, তাও সময় বড়জোর পাঁচ বছর। কিন্তু, বিধির কি অদ্ভুত খেয়াল, বেঁচে গেলেন তিনি। আর বেঁচে গেলেন বলেই প্রথম এশিয়ান হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার এল এক বাঙ্গালির কাছে, আমি যে ভাষায় কথা বলি, যে ভাষায় এই মুহূর্তে লিখছি, সেই একই ভাষায় কথা বলা একজন মানুষ এত বড় একটা সাফল্য বয়ে আনলেন।

আপনারা এতক্ষণে হয়তো বুঝে গিয়েছেন, লোকটি কে। হ্যাঁ, আমি অমর্ত্য সেনের কথা বলছি, রবি ঠাকুর যার যথার্থই নাম দিয়ে গিয়েছিলেন – অমর্ত্য – immortal!
 
অমর্ত্য সেনের কাজের একটা বড় অংশই ছিল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত আর্থিকভাবে অসচ্ছল লোকদেরকে ঘিরে এবং কিভাবে তাদের ভাগ্যের উন্নতি ঘটানো যায় সেটা নিয়ে।
যখন অমর্ত্য সেনের বয়স ১০ বছর তখন পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। সেই দুর্ভিক্ষ তাকে ভাবিয়ে তুলল। এরপর থেকে যত দুর্ভিক্ষ এসেছে, যুগে যুগে, দেশে দেশে, তা তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে দুর্ভিক্ষগুলোর ভেতর একটা অদ্ভুত সামঞ্জস্যতা আছে। যখন কোথাও দুর্ভিক্ষ হয় তখন গরিব মানুষেরা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মারা যায়। এর কারন এইনা যে দুর্ভিক্ষের সময় কোথাও কোনও খাবার থাকে না, বরং গরিবদের সেই খাবার কেনার আর্থিক ক্ষমতা থাকে না। এখান থেকে তিনি গণতন্ত্র আর দুর্ভিক্ষ এড়ানোর একটা যোগসূত্র পেলেন। তিনি বললেন, যে, সরকার যত বেশি ফ্রিডম এক্সারসাইজ করবে, যত বেশী দায়িত্ব নিবে, ততই দুর্ভিক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে অথবা হলেও ক্ষতি কম হবে।

যাইহোক, একবার অমর্ত্য সেন একটা গবেষণায় নামলেন। যেখানে তার একটা উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামাঞ্চলের ছেলে আর মেয়েদের পার্থক্য বোঝা। এর অংশ হিসেবে তার ছেলে মেয়েদের ওজন নেওয়ার প্রয়োজন পড়ল। তিনি এই কাজের জন্য একজন সহযোগী নিয়োগ দিলেন যার কাজ হল গ্রামে গ্রামে যেয়ে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ওজন নেওয়া। কিন্তু কেউই তার সহযোগীর কথা শুনতে চায় না। কাজ তাই এগুচ্ছিল না। এই সমস্যা দূর করার জন্য তিনি নিজেই একটা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পরলেন। এত বড় একজন বিদ্বান মানুষ যখন এই কাজে নামলেন তখন আর কেউ না করতে পারল না। দিনের পর দিন, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্য গ্রামে সাইকেল চালিয়ে বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের ওজন তিনি সংগ্রহ করলেন। এই তথ্য ও উপাত্তের উপর দাঁড়িয়ে গেলো তার আরও একটা হাইপোথিসিস।

এই ছবিতেই আপনারা দেখতে পাচ্ছেন অমর্ত্য সেনের সেই বাইসাইকেলটি। আরও অনেক মহামূল্যবান নিদর্শনের মাঝে সাইকেলটি শোভা পাচ্ছে সুদূর সুইডেনের স্টকহোমের নোবেল জাদুঘরে। যেখানে হাঁটলেই আরও অনেক নোবেল জেতা কালজয়ী মানুষদের ব্যবহার করা জিনিশ দেখা যায়, দেখা যায় তাদের বিভিন্ন উক্তি, আর আবিষ্কার সম্পর্কে পাওয়া যায় ধারনা। সাদা চামড়ার সাহেবদের উপর বিভিন্ন কারণে আমাদের ক্ষোভ থাকতে পারে কিন্তু, তারা গুণীদের যথার্থ সম্মান দিতে ভুল করেন না। তাইতো পশ্চিমবঙ্গ থেকে জাহাজে করে সুদূর স্টকহোমে সাইকেলটি নিতে তারা ভুল করেননি। ভুল করেননি এমনভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নোবেল জয়ীদের জিনিস সাজিয়ে রাখতে। যেগুলো চোখের দেখা দেখেও অদ্ভুত উত্তেজনায় গায়ে কাটা দেয়, জাদুঘরের প্রতিটি পদক্ষেপেই এনে দেয় অনুপ্রেরণা, পৃথিবীকে এগিয়ে নেওয়ার অনুপম নিদর্শন দেখে।

(ছবিটি ২০১৫ এর মার্চে তোলা)

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT