অনন্য ইস্তানবুল!

What is your dream destination?

অনন্য ইস্তানবুল!

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে রাত ১০:০০ টায় ইস্তানবুল পৌঁছলাম, এই নিয়ে তৃতীয়বার। তুরস্কের ভিসার ব্যাপারে বাংলাদেশীদের জন্য একটা সুন্দর নিয়ম আছে – আপনার যদি সেনজেন, ইউএস, ইউকে, ইইএ, ওইসিডি দেশগুলোর যেকোনো একটার ভ্যালিড ভিসা থাকে তাহলে বাংলাদেশী সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে আপনি অন এরাইভাল ভিসা পাবেন। সময় বাঁচাতে আগে থেকেও ই-ভিসা করে নিতে পারেন, এই ওয়েবসাইট থেকে। বাংলাদেশী সহ আরও কিছু দেশের লোকদের জন্য আলাদা লাইন। ইমিগ্রেশন পার হয়েই দৌড় – গন্তব্য – পুরনো শহর – সুলতান আহমেদ স্কোয়ার।

ইস্তানবুল – গ্যালাটা ব্রিজের কাছ থেকে তোলা

 

ইস্তানবুল কামাল

ইস্তানবুল কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দর হতে সুলতান আহমেদ স্কোয়ারের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। আপনি ট্যাক্সি নিয়ে নিলে ঝামেলা শেষ। আমি বিদেশে গেলে সাধারণত পাবলিক পরিবহণে উঠি। এতে টাকাও কম লাগে আর দেশটি সম্পর্কে প্রাথমিক একটা ধারনাও পাওয়া যায়। সমস্যা হল, বিমানবন্দর থেকে সুলতান আহমেদ স্কোয়ার সরাসরি একটা পরিবহনে উঠেই পৌঁছান যায় না। মেট্রো ট্রেন আর ট্রাম, এই দুইটি বাহনের সাহায্যে যেতে হয় সুলতান আহমেদে। ইমিগ্রেশন থেকে বের হয়ে কারেন্সি পরিবর্তন করে নিলাম। যথারীতি বিমানবন্দরে লিরা করার জন্য ভাল রেট পেলাম না। পাশাপাশি ৩ টা মানি এক্সচেঞ্জে আবার দুই রকমের রেট! লিরা পকেটে পুরে আরেকটু  সামনে যেতেই মেট্রোতে যাওয়ার চিহ্ন দেখতে পেলাম। এরপর টিকেট কাটার যন্ত্র থেকে একটা ইস্তানবুলকার্ট(istanbulkart) কিনে ফেললাম। ইস্তানবুলকার্ট দিয়ে যেকোনো পাবলিক যানবাহনে যাতায়াত করা যায়, এর টাকা শেষ হয়ে গেলে বিভিন্ন জায়গায় টাকা ভরা যায়। একাধিক লোক থাকলেও একটাই ইস্তানবুলকার্ট কিনতে পারেন টাকা বাঁচানোর জন্য, একটা কার্ড একাধিক মানুষ ব্যবহার করতে পারে।

এটাই যেহেতু লাইনের প্রথম স্টেশন তাই চোখ বন্ধ করে মেট্রো ট্রেনে উঠে পড়লাম। বেশ কয়েকটি স্টেশন পর যখন ট্রেনটি জেয়তেনবরনু (Zeytinburnu) স্টেশনে থামল তখন নেমে পড়লাম, এখান থেকেই ট্রাম ধরতে হবে। স্টেশনের ঠিক বাইরেই ট্রামের প্লাটফর্ম, এমিনোনুর দিকে যেই ট্রামটা যাচ্ছে সেখানে উঠে পড়ে আধা ঘণ্টা পরেই সুলতান আহমেদ স্কোয়ারে পৌঁছে গেলাম। তখন রাত প্রায় ১২:০০ টা, রাতের আলোর সৌন্দর্য কনকনে ঠাণ্ডায় খুব বেশি সময় উপভোগ করতে পারলাম না, হোটেলটাও আবার খুঁজে বের করতে হবে!

map

যোগাযোগ ব্যবস্থার ম্যাপ – আমাদের যাত্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী (Source)

সুলতান আহমেদ স্কোয়ারের আশেপাশেই ইস্তানবুলের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনাগুলো রয়েছে – হিপোড্রম, ব্লু মস্ক, আয়া সোফিয়া, আর টপক্যাপি প্যালেস। এখন যেটাকে সুলতান আহমেদ স্কোয়ার বলা হয় সেটাই আসলে কন্সটান্টিনোপোলের হিপোড্রম। এখানেই বাইজান্টাইন সভ্যতার রাজধানী কন্সটান্টিনোপোলের মানুষজন তাদের অবসর সময় কাটাতো। এখানেই একসময় ঘোড়ার দৌড়ের প্রতিযোগিতা হত, যেটা দেখতে অজস্র মানুষের ভিড় নামত। এখন দেখলে অবশ্য তার কিছুই টের পাওয়া যাবে না। এখন সেখানে পর্যটকদের মেলা, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে, সাথে খরচও তুলনামূলকভাবে কম আর চমৎকার আবহাওয়া, সব মিলিয়ে চারদিক লোকে লোকারণ্য।

ব্লু মস্ক বা সুলতান আহমেদ মসজিদ কিন্তু বাইরে থেকে দেখতে নীল না। এর নামের মর্ম বুঝতে আপনাকে ভেতরে যেতে হবে।  ভেতরের টাইলসগুলো নীল, সূর্যের আলোতে ভেতরে এক অদ্ভুত সুন্দর নীলাভ আভা তৈরি হয়।  একটা বড়, আটটা ছোট গম্বুজ, সাথে ছয়টা মিনার – অটোমান সভ্যতার অনেক মসজিদের সাথেই এর স্থাপত্যশৈলীর মিল আছে। নামাজ পড়ার সময়টা ছাড়া যে কেউই ঢুকতে পারে এখানে।

ব্লু মস্কের ঠিক উলটো দিকেই হাগিয়া সোফিয়া বা আয়া সোফিয়া – পুরনো দিনের সপ্ত আশ্চর্যের একটা। হাগিয়া সোফিয়ার বেশ মজার ইতিহাস আছে। কন্সটান্টিনোপোলের শাসনামলে,  এটা ছিল একটা গির্জা। পরবর্তীতে অটোমানরা তুরস্ক দখল করে এটাকে মসজিদ বানিয়ে ফেলে।  ১৯৩৫ সালে কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতায় এসে, মসজিদ বন্ধ করে এটাকে জাদুঘরে রূপান্তর করার ঘোষনা দেন। সে সময় থেকেই এটা সবার জন্য উম্মুক্ত। ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে যে বিভিন্ন জায়গায় মূর্তির ছবি এবং চিত্রকর্ম গুলো তুলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। আবার কোথাওবা ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই শিল্পকর্মগুলো আবার উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে এখন। ইসলামি নিদর্শনের ফাঁকে ফাঁকেই যীশু এবং মা মেরীর ছবি উঁকি দেবে।

fullsizeoutput_255a

হাগিয়া সোফিয়া – গির্জা থেকে মসজিদ হয়ে এখন জাদুঘর – দুইদিকে ইসলামি নিদর্শনের মাঝখেনেই মূর্তি দেখা যাচ্ছে

“বসফরাস প্রণালী” – ছোটবেলার বইয়ে পড়া এক পরিচিত নাম, যেই প্রণালীর এক পাশে ইউরোপ আর অন্য পাশে এশিয়া। সেই বসফরাসে জাহাজে করে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন ছিল অনেকদিনের। এর আগেরবার সময় স্বল্পতার জন্য না পারলেও এবার আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। অসংখ্য বেসরকারি ট্যুর অপারেটর আছে যারা “বসফরাস ক্রুজ” এর ব্যবস্থা করে দেয়। একটাই সমস্যা, এর জন্য আপনাকে বেশ ভাল অঙ্কের টাকা গুনতে হবে – ত্রিশ থেকে কয়েকশ ইউরো। একটু খোঁজাখুঁজির পর এর সমাধান পেয়ে গেলাম – “সেহির হাটলারি ফেরি” – ইস্তানবুলে ওরাই পানি পথে পাবলিক যাত্রী পরিবহণ করে।

ভোর বেলা কিছুক্ষণ সমুদ্রের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করে, আবার সুলতান আহমেদ চত্বরে এলাম, কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বসফরাস ক্রুজের ফেরির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। সুলতান আহমেদ চত্বর থেকে সেহির হাটলারি ফেরি ছাড়ার জায়গা খুব বেশি দূরে না, আবার খুব কাছেও না। তাই কাবাতাসের দিকে যাওয়া ট্রামে চেপে বসলাম, সাথে তো ইস্তানবুলকার্ট আছেই! এক/দুইটা স্টপেজ পর এমিননু তে নেমে পড়লাম। গোল্ডেন হর্নের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এমিনোনু মোক্ষম এক জায়গা। সবসময় বেশ ভিড় লেগে থাকে এখানে, অনেক রেস্তোরাঁও আছে যেখানে মানুষ বাইরে বসে খাওয়া দাওয়া করে আর গল্পগুজবে অলস সময় কাটায়। চুপচাপ বসে থেকে নীল আকাশ আর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দিব্যি সময় কেটে যায়।
যেখানে ট্রাম থেকে নামলাম সেখান থেকে রাস্তা পার হয়ে ফেরির টার্মিনাল খুঁজে পেতে কিছুটা বেগ পেতে হল, কারণ, বেশ কয়েকটা জায়গায় ফেরি যায়। এই জায়গাটাতে বেশ কিছু লোক দেখলাম যারা বসফরাস ক্রজের বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়ে পেছন পেছন আসল, সবাইকে ধন্যবাদ আর কিছুই লাগবেনা বলাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ মনে হল।



এমিননু থেকে সকাল ১০:৩৫ এ ফেরি ছাড়ে, কিন্তু ঘন্টাখানেক আগে না গেলে টিকিট অথবা ভাল জায়গা পাওয়া যায় না। এখানে দুইটা উপায় আছে, ২৫ টার্কিশ লিরা দিয়ে ডাবল ওয়ে টিকেট কাটা, অথবা ১৫ টার্কিশ লিরা দিয়ে সিঙ্গেল ওয়ে। এমিননু থেকে ছেড়ে ফেরিটা বিভিন্ন জায়গায় লোক নেওয়া আর নামানোর জন্য থামে। জায়গাগুলো হল বেসিকতাস, কানলিকা, সারিয়ের,  রুমেলি কাভাগি আর আন্দলু কাভাগি। আন্দলু কাভাগি হচ্ছে শেষ স্টপেজ, এখানে ফেরি পৌঁছায় দুপুর ১২:১০ এ। আবার এখান থেকে ফিরতি ফেরি বিকেল তিনটায়। ফেরিটা বেশ দ্রুত চলে, আর ইস্তানবুল শহর থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। সবচেয়ে ভাল হচ্ছে, ফেরি থেকে কোনো এক জায়গায় নেমে যাওয়া। তারপর বেশ কিছুটা সময় সেই গ্রামে হেঁটে বেড়ানো। তুরস্কের গ্রাম কেমন হয় তার কিছুটা ধারনা এতে পাওয়া যাবে। যেহেতু শহর থেকে দূরে তাই, এসব জায়গার খাবার তুলনামূলক ভাবে সস্তা, সমুদ্রের পাশে হওয়ায় ভাল ভাল মাছও পাওয়া যায়।

আরেকটা স্থাপনা – ফেরি থেকে তোলা

আমরা সিঙ্গেল ওয়ে টিকেট কেটে জেটিতে দাঁড়িয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। যখন ফেরিতে ওঠার গেট খুলে দিল তখন সবাই হুড়মুড়িয়ে ওঠা শুরু করল। দুই তলার উম্মুক্ত জায়গার সামনে আর দুই পাশে বেশ কিছু বেঞ্চ থেকেই চারপাশ সবচেয়ে ভাল দেখা যায়। সেখানে বসার জন্যই সবার এত ব্যস্ততা!

এখন চুপ করে বসে ফেরি ছাড়ার অপেক্ষা। চারদিকে চোখ মেলে ইস্তানবুল শহর দেখতে লাগলাম। হাগিয়া সোফিয়া আর ব্লু মস্ক প্রায় একইরকম দেখতে। অন্যান্য অনেক স্থাপনাতেও একই রকম স্থাপত্যশৈলীর ছোঁয়া। মাঝে মাঝেই আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম যে কোনটা দেখছি, যেদিকেই তাকাই শুধু ব্লু মস্ক ই দেখতে পাই! এখান থেকেই দেখা যায় বিখ্যাত গ্যালাটা সেতু, সেতুর ওপর সারি সারি ছিপ, সাধারণ মানুষ ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। সেতুর নিচেই অনেক মাছের দোকান, টাটকা মাছ রান্না করে দিচ্ছে। রাস্তায় ব্যস্ত মানুষজন ছোটাছুটি করছে, কেউ বা ট্রাম ধরার জন্য, কেউবা বাস, তার মাঝে ছুটে চলছে হলুদ রঙের ট্যাক্সি আর পতপত করে উড়ছে তুরস্কের লাল পতাকা। দূর দিগন্তে মিনারের ছবি, পুরনো স্থাপনার মাঝেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে নতুন নতুন সব স্থাপনা।

অবশেষে হর্ন দিতে দিতে ফেরি ছাড়ল। ফেরিতে বেশিরভাগই পর্যটক আর হাতে হাত দিয়ে কপোত কপোতী। ঠাণ্ডা বাতাসের ভেতর চলন্ত ফেরির সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সহযাত্রী হল অসংখ্য পাখি। এর মাঝে আবার একটা মেয়ে পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাতাসে ছোড়া শুরু করল, সেগুলো লুফে নিতে বিপুল উদ্যমে পাখিগুলোও উড়তে লাগল।

অনেকটা সময় পাখিগুলো আমাদের সঙ্গী ছিল

যতই সামনে এগুতে লাগলাম সমুদ্রের দু’ধারে ঘর-বাড়ি আর সবুজ গাছ চোখে পড়ল। মাঝে মাঝে দুই-একটা বড় প্রাসাদও আছে। ইস্তানবুল পুরোটা সমতলের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বাড়িগুলো দূর থেকে দেখে বিভিন্ন ভাঁজে ভাঁজে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়। হঠাৎ মানুষের চাপা চিৎকার শুনে পেছন ফিরে দেখলাম যে একটা সেতুর কাছাকাছি চলে এসেছি। দেখতে সাধারণ হলেও সেতুটি আর দশটি সেতুর মত নয়। এশিয়া আর ইউরোপকে এক করেছে এই সেতু – সেতুর একপাশে এশিয়া আর অন্যপাশে ইউরোপ। এরকম একইরকম দুইটি সেতু আমরা পার হলাম।

এশিয়া – ইউরোপ কে যুক্ত করা ব্রিজ

ফেরির ভেতরেই কিছুক্ষণ পরপর গরম কফি আর খাবার নিয়ে বিক্রেতারা হাজির, নিচেও খাবারের দোকান আছে। দু’পাশের চোখ জুড়ানো দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় বুঝতে পারলাম যে আরও সামনে যাওয়ার সময় আমাদের হাতে নেই, প্লেন ধরতে হবে, তাই, জাহাজ থেকে আমরা নেমে পড়লাম সারিয়েরে।



সারিয়েরের এক দোকান

সারিয়ের ইস্তানবুলের সবচেয়ে উত্তরের জেলা। গ্রাম বললেও অত্যুক্তি হবে না।

সারিয়েরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। এখন শহরে ফেরার পালা। রাস্তার পাশের লোকজনদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম যে কিভাবে শহরে ফিরতে পারি। ওখানকার কেউই আমাদের ভাষা বুঝতে পারল না, আমরাও ওদেরটা। যা আছে কপালে ভেবে, মোটামুটি ম্যাপের ওপর ভরসা করে একটা বাসে চেপে বসলাম।

এক্কেবারে ঢাকার মতন ভিড়, দাঁড়িয়ে থাকাই দায়, তারপর আবার দুই পা যেতে না যেতেই একটা করে স্টপেজ। এই গরুর গাড়ি মার্কা বাসেও কিন্তু সামনে একটা বড় ইলেক্ট্রনিক ডিসপ্লে আছে, সেখানে সামনে কোন কোন স্টপেজ আছে আর কোন স্টপেজে থামবে তার নাম দেখাচ্ছে। আমরা একসময় বুঝতে পারলাম যে এই গতিতে আগাতে থাকলে সারা জীবনেও শহরে পৌঁছতে পারব না। আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করল হাতে থাকা ইস্তানবুলের যাতায়াত ব্যবস্থার ম্যাপটা। সুযোগ বুঝে নেমে পড়লাম একটা মেট্রো স্টেশনের কাছে, মেট্রোতে করে পৌঁছে গেলাম তাকসিমে।

কাবাতাস থেকে তাকসিম যাওয়ার পথে ফিউনিকুলার রেইলওয়েতে ওঠার স্বাদও পেয়ে গেলাম। ঢালু, ৫০০ মিটারের পথ, মাত্র ৩ মিনিটে পৌঁছে গেলাম। তাকসিম স্কোয়ারকে আধুনিক ইস্তানবুলের হৃদপিণ্ড বলা যায়। জায়গাটা অল্পবয়স্ক তরুণ – তরুণীরা জমজমাট করে রেখেছে। কেউবা খেলছে, কেউবা আড্ডায় মশগুল আর কেউবা বাজনা বাজিয়ে গান গাইছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো কিন্তু তরুণ তরুণীদের এই মিলনমেলার সুযোগ নিয়েছে – ম্যাকডোনাল্ডস, সাবওয়ে, পিজ্জাহাট, বার্গার কিং সব কিছুই একদম পাশাপাশি। তাকসিম স্কোয়ারের পাশেই একটা পার্ক আছে, গেজি পার্ক – ২০১৩ সালে সেই পার্ক ভেঙ্গে তুরস্ক সরকার আরও মার্কেট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার প্রতিবাদে তাকসিম স্কোয়ারে ঘটে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক বিক্ষোভের কথা তো প্রায় সবাই জানেন। ‘অক্যুপাই তাকসিম’ নামে পরিচিত এই বিক্ষোভে প্রায় তিন মিলিওন লোক অংশ নেয়, এগার জন মারা যায়। শেষ পর্যন্ত পার্ক ভেঙ্গে মার্কেট করার সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয় তুরস্ক সরকার।

১০

ইস্তানবুলকে ফুলের শহরও বলা যায়।  কিছুদূর পরপরই নাম না জানা রং বেরঙের ফুল আপনার মনকে ভাল করে দেবে। সাজানো বাগানে হাঁটতে হাঁটতে, কখনো কোলাহল আবার কখনো নির্জনতায় হঠাৎ করে মোড় ঘুরেই অনুভব করবেন সমুদ্রের হাওয়া আর নাকে আসবে অদ্ভুত লোনা গন্ধ – এ শুধু ইস্তানবুলেই সম্ভব!

fullsizeoutput_255c

কিছু দূর পরপরই ফুলের দেখা মিলবে

১১
fullsizeoutput_255b
খানা – পিনা

ইস্তানবুলে আসবো, আর খাওয়া দাওয়ার কথা হবে না, তাই কী হয়? তুরস্ক বিভিন্ন ধরনের কাবাবের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। ইস্কান্দার কাবাব, শিশ কাবাব, উরফা কাবাব, ডোনার কাবাব – নাম বলে শেষ করা মুস্কিল। খাবারের অর্ডার দিয়ে রাস্তার পাশে বসেই বেশিরভাগ মানুষ খাওয়া দাওয়া করে। শহরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে খাওয়াটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক বলে মনে হল। সেরকমই এক দোকানে খাবারের অর্ডার দিয়ে খেতে খেতে বুঝতে পারলাম ইস্তানবুলের থাকার সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এবার যাওয়ার পালা। চটপট কিছু টার্কিশ ডিলাইট কিনে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম, অসাধারণ কিছু মুহূর্তের স্মৃতি সঙ্গী করে।

পরিশিষ্ট

তুরস্ক মুসলিম প্রধান দেশ হলেও ইউরোপের কাছাকাছি হওয়াতে পাশ্চাত্যের হাওয়া ভালমতোই এর গায়ে এসে লেগেছে। রাস্তায় যেমন বোরখা পরা মেয়ে দেখা যায় তেমনি হাফ প্যান্ট পরা মেয়েদের সংখ্যাও কম না। তুরস্কের ছেলেদের আমার একটু রুক্ষ(rough) মনে হয়েছে, তবে তুরস্কের মেয়েরা খুবই সুন্দর! এক বার দেখে চোখ ফেরানো কঠিন।

fullsizeoutput_255d

গ্র্যান্ড বাজার

ইস্তানবুলের ভেতর অন্যান্য দর্শনীয় জায়গা হল – গ্র্যান্ড বাজার(ঢাকা কলেজের বাজারগুলোর মতন, কিন্তু এটা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো এবং বড় বাজার গুলোর একটা, প্রায় চার হাজার দোকানে প্রতিদিন তিন লাখের কাছাকাছি লোক আসে), স্পাইস বাজার (মসলা, বাদাম, মিষ্টি জাতীয় জিনিস পাওয়া যায় ), টপক্যাপি প্যালেস (এখানে মহানবী(সঃ) এর দাড়ি, মুসা(আঃ) এর লাঠি আছে), ব্যাসিলিকা সিস্টারন, গ্যালাটা টাওয়ার, রুমেলি হিসার, দোলমাবাঁচে প্যালেস। এশিয়ার দিকে জিনিসপত্রের দাম অনেক কম।

ইস্তানবুল থেকে সামান্য দূরে যেতে চাইলে প্রিন্সেস আইল্যান্ড, গ্যালিপোলি, অথবা ট্রয়ে যেতে পারেন, সবগুলোর জন্যই অন্তত একদিন হাতে সময় রাখতে হবে।

পৃথিবীতে ঘোরার অনেক জায়গা আছে, এজন্য আমি একই জায়গায় একাধিকবার যেতে চাই না, কিন্তু সময় আর সুযোগ পেলে আমি আবার ইস্তানবুলে যাব, শহরটাকে কোনো এক অজানা কারণে আমি ভালবেসে ফেলেছি। ওহ! বিমান থেকে নামার সময় বা বিমান ছাড়ার সময় ইস্তানবুলের ছবি দেখা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, দিনে একরকম, আর রাতে অন্যরকম, এর বর্ণনা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না, এটা আপনাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম!

Fuad Omar

Fuad Omar

1 Comment

LEAVE A COMMENT