ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর সুন্দর

What is your dream destination?

ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর সুন্দর

http://ostacamping.com/fonts.googleapis.com/css?family=Roboto Condensed:400,700,300 ছোটবেলায় রূপকথার গল্প পড়ে নিজেকে রাজপুত্র হিসেবে কেইবা কল্পনা করেনি! সেই যে রাজপুত্র যে কিনা পঙ্খিরাজে করে সাত সমুদ্র-তের নদী পাড়ি দিয়ে গভীর সমুদ্রের তলা থেকে সিন্দুক খুলে দৈত্যের প্রাণভোমরা বের করে নিয়ে আসত! স্বপ্নে, সেই রাজপুত্রের মত কতইনা ঘোড়ার পিঠে চড়ে দিক দিগন্তে ঘুরে বেড়িয়েছি। বাস্তবে সেই ঘোড়াতে চড়তে পারলাম পাহালগামে এসে – কিন্তু রাজপুত্রের মত নয়, অনেক মুলামুলি করে, অনেক টাকা দিয়ে – দুরু দুরু বক্ষে। শুধু ভয়, কখন যেন পড়ে যাই। আমি যদি পড়ে নাও যাই, ঘোড়াটা যদি পড়ে যায়? পাথুরে রাস্তায় মানুষের পা হড়কে যায়, ঘোড়ার আর দোষ কি? আমি অথবা ঘোড়া কোনটাই অথবা দুইটাই পড়ে যাওয়ার আগেই ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম এমন সময় সম্বিত ফিরে পেলাম আমার সাথে থাকা গাইড, টগবগে কাশ্মীরি তরুণ আলতাফ শেখের কথায়। আলতাফ জিজ্ঞেসা করল – তুমি কোথা থেকে এসেছ? যখন বললাম যে বাংলাদেশ – সাথে সাথেই সে থেমে গেল, তার মুখ হয়ে গেল কাশ্মীরের আকাশের চেয়েও উজ্জ্বল। উৎফুল্ল কণ্ঠে আমাকে বলে উঠল –  “তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছ! তোমরা যেমন স্বাধীনতা এনেছ, আমরাও একদিন তেমনি স্বাধীনতা আনব!” তার ভাষায় আজাদি।

Viagra where can i buy in Fort Lauderdale Florida হায় স্বাধীনতা! হায় আজাদি! যতদিন ছিলাম, এই শব্দ, এই স্বপ্ন, এই আক্ষেপই প্রতিধ্বনিত হল কাশ্মীরি উপত্যকায়।

http://90daygreatbody.com/?kuid=simulatore-di-trading-gratuito-demo&63a=d4 আমার বয়স যখন প্রায় চৌদ্দ তখন সত্যজিৎ রায়ের লেখা ভূস্বর্গ ভয়ঙ্করে কাশ্মীরের বর্ণনা পড়েছিলাম। জটায়ুর প্রস্তাবে ফেলুদা আর তপেস কাশ্মীর গেলেন। ডাল লেকে বোটহাউজে রাতে থাকলেন, এরপর চলে গেলেন পাহালগামে, তাঁবু টাঙ্গিয়ে থাকার জন্য। মাঝখানে এক বিচারকের সাথে পরিচয় হল যিনি অবসরের পর এখন একটা বই লিখছেন। সারা জীবনে অনেককেই ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছেন তিনি। তাদের ভেতর যে সবাই অপরাধী না, কিছু ভুল যে তার হয়েছে এটা তার সন্দেহ। সেই সন্দেহ ঘোচানোর জন্য প্লানচেট করে তিনি সেইসব মৃত মানুষের আত্মা নামান আর জিজ্ঞেস করেন যে আসলেই তারা খুন করেছিল কিনা। সেই বিচারক একদিন কাশ্মীরে খুন হলেন আর ফেলুদা নেমে পড়লেন তদন্তে। এই বইটা পড়েই প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলাম কাশ্মীর যাওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে হতে বিশটি বছর কেটে গেল!

follow url কাশ্মীরকে পৃথিবীর স্বর্গ বলা হয়। অনেকে আবার এক ধাপ বাড়িয়ে বলেন যে স্বর্গ নাকি কাশ্মীরের মত করে বানানো হয়েছে। কিন্তু কাশ্মীরের ঠিক কোথায় বেড়াতে যাব এই নিয়ে আমি যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। বেশ কিছুটা পড়ে যা বুঝলাম তা হল ভারতের সবচেয়ে পশ্চিম রাজ্য জম্মু এন্ড কাশ্মীর আসলে তিনটা রিজিওনে বিভক্ত – জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা আর লাদাখ বিভাগ। এর সাথে আবার কাশ্মীরের একটা অংশ পাকিস্তানের দখলে আর একটা চীনের। শীতের সময় জম্মু এন্ড কাশ্মীরের রাজধানী থাকে জম্মুতে আর গরমের সময় শ্রীনগরে। লাদাখে বৌদ্ধরা সংখ্যায় বেশি, জম্মুতে হিন্দুরা, আর কাশ্মীর উপত্যকায় মুসলিমরা। পর্যটকরা ঘুরতে বেশি যায় লাদাখ আর শ্রীনগরে কারন এই দুইটা জায়গা আর তার আশপাশ অনেক সুন্দর। একটু অবাক করার মত বিষয় হল, সমস্ত ভারতে রেললাইনের নেটওয়ার্ক খুব ভাল হলেও, কাশ্মীর উপত্যকা বা লাদাখে সেই অর্থে রেললাইন নেই। জম্মু পর্যন্ত ট্রেন আছে। কেউ যদি শ্রীনগর যেতে চায় তাহলে দিল্লী থেকে ট্রেনে করে জম্মু পর্যন্ত আসতে হবে চৌদ্দ ঘণ্টা ট্রেনে চড়ে। এরপর ট্যাক্সিতে আরও সাত/আট ঘণ্টা পর শ্রীনগর। এদিকে লাদাখ যাওয়ার মোটামুটি দুইটা উপায় আছে। হিমাচল প্রদেশের মানালি থেকে লাদাখ পৌঁছানো যায় – এতে প্রায় বাইশ ঘণ্টা মত লাগে। আর শ্রীনগর থেকে নয় ঘণ্টায় লাদাখ আসা যায়। শ্রীনগরে যাওয়ার একটা উপায় তো ওপরে বলেছিই। শ্রীনগর অথবা লাদাখে দিল্লী থেকে বিমানেও যাওয়া যায়। লাদাখের কাছাকাছি বিমানবন্দর হল লেহ। আর শ্রীনগরের বিমানবন্দের নাম একই নামে।

club de rencontre saint tropez তাহলে মোটামুটি যা দাঁড়াল তা হল, প্লেনে না গেলে ঢাকা থেকে কাশ্মীর যাওয়ার উপায় হলঃ

source site ঢাকা -> (বিমানে ৩০ মিনিট অথবা বাস/ট্রেনে ১৬ ঘণ্টা) -> কলকাতা -> (বিমানে আড়াই ঘণ্টা অথবা ট্রেনে আঠার থেকে পঁচিশ ঘণ্টা) -> দিল্লী -> ২২ ঘণ্টায় -> কালকা -> শিমলা -> লাদাখ -> (গাড়িতে নয় ঘণ্টা) -> শ্রীনগর

speed dating london reddit ঢাকা -> কলকাতা -> (বিমানে আড়াই ঘণ্টা অথবা ট্রেনে আঠার থেকে পঁচিশ ঘণ্টা) -> দিল্লী -> (ট্রেনে চৌদ্দ ঘণ্টা)  -> জম্মু -> (গাড়িতে আট ঘণ্টা)  -> শ্রীনগর -> (গাড়িতে নয় ঘণ্টা) -> লাদাখ

piattaforma borsa binaria সব পড়ে ঠিক করলাম যে কাশ্মীর ভ্যালিতেই যাব।  লাদাখে যেহেতু বৌদ্ধদের সংখ্যা বেশি তাই এই এলাকাটার সাথে ভুটানের কিছুটা মিল আছে। আর আমি ভুটানে আগে গিয়েছি। এদিকে আবার  বয়স হয়ে গিয়েছে, ছাত্রজীবনের মত অফুরন্ত সময় হাতে নেই। তাই খরচ বেশি হলেও শ্রীনগরে বিমানে করে যাওয়াটাই আমার কাছে ভাল মনে হল। ডিসেম্বরে অন্নপূর্ণা আর মিশর অভিযান শেষ করেই ঠিক করে ফেললাম যে কাশ্মীরে এপ্রিলে যাব। জানুয়ারি থেকেই পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেল আর টিকেট কাটা শুরু করলাম। এপ্রিলে গরমকাল শুরু হয় কাশ্মীরে, তীব্র শীতের কামড় থেকে জেগে উঠতে থাকে উপত্যকা আর টুরিস্টরাও এসময় আসতে শুরু করে।

Gts iqoption trading con 1 euro 1 minute binary option system Soldi facili con opzioni binarie Trading bonus gratuito Opzioni bunarie Trading on line ১২ এপ্রিল ঢাকা থেকে কলকাতার বিকেলের টিকেট কাটা ছিল। এরমাঝে দুইটা বিপদ এসে হাজির হল। আবহাওয়াগত কারনে কাশ্মীরে সাধারণত কখনই বন্যা হয় না।  ৬ এপ্রিলের দিকে দেখলাম যে কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে, থামার কোন লক্ষণই নেই। বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই খবর দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। এর চেয়েও বড় দুঃসংবাদ পেলাম ১০ এপ্রিল। কাশ্মীরে একটা ভোটাভুটি হচ্ছিল। সেখানে আর্মি গুলি করে একজন না দুইজন না, বার জনকে মেরে ফেলেছে। একজন আবার সেইসবের ভিডিও পাঠাল। মারামারি, হুলুস্থুল, লাশ, রক্ত – সে এক ভয়াবহ অবস্থা। সবাই ভয় দেখাতে শুরু করল – আমার অবশ্য নিজেকে নিয়ে চিন্তা নেই, কিন্তু দলের অন্যান্যদের দায়িত্বও তো আমার কাঁধেই! এই দু’টো জিনিস ভুলে গিয়ে বারই এপ্রিল অফিস থেকে একটু আগে বের হয়ে জ্যাম ঠেলে কোনওমতে ঢাকা থেকে ৫:১৫ এর কলকাতার ফ্লাইট টা ধরতে পারলাম। বিমানের খাবারের প্যাকেট টা খুলতে না খুলতেই দেখি বিমান কলকাতা পৌঁছে গেল! ইমিগ্রেশন খুব তাড়াতাড়িই পার হয়ে গেলাম, ব্যাগ পেতেও কোনও সময়ই লাগল না। আমি ভেবে পাই না যে আমাদের দেশের বিমানবন্দরে ব্যাগ পেতে এত সময় কেন লাগে!

Requisendo cotoniamoci subisso? Sanguinolente stipendiasse stertori addormirmi http://statusme.com/wp-json/oembed/1.0/embed?url=http://some-inexistent-website.acu/some_inexistent_file_with_long_name?.com/ broker opzione di trading binario fognando parafrasano profetizzerete. ঢাকা থেকে কলকাতার বিমানবন্দর মাত্র তিরিশ মিনিট, কিন্তু এই তিরিশ মিনিট দূরত্বের বিমানবন্দর দেখে রীতিমত ঈর্ষা হল। ঝকঝকে, তকতকে, বিশাল বিমানবন্দর। একবার ভাবলাম যে শহর থেকে একটা ঢুঁ মেরে আসব কিনা। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা কলেজ স্ট্রিট।  কিন্তু পরের ফ্লাইট রাত নয়টাতে, হাতে সময় ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। যাব নাকি যাব না, এটা ভাবতে ভাবতেই আরও আধা ঘণ্টা চলে গেল। শেষ পর্যন্ত কোথাও আর যাওয়া হল না। অগত্যা বাইরে বের হয়ে কিছু খাবার খোঁজার চেষ্টা করলাম। কাজের মধ্যে যা হল তা হল, বেশ কিছু পয়সা খসল আর মুখে দেওয়া যায় না এমন এক প্যাস্ট্রি গিললাম। সাথে, একটা টং মত দোকান থেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কাপে কয়েক মিলিমিটার চা দিয়ে গলার কিয়দংশ ভেজালাম।

cosa significa fare trading কলকাতা থেকে দিল্লী যেতে বিমানে আড়াই ঘণ্টা মত লাগে। জেট এয়ারওয়েজে দেখলাম ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট স্ক্রিন হাওয়া। তার বদলে মোবাইল বা ল্যাপটপে ওয়াইফাই দিয়ে ঢোকা যায়, আর সেই ওয়াইফাই দিয়ে শুধু মাত্র জেট এয়ারওয়েজের অ্যাপগুলোই দেখা যায়। অর্থাৎ, সবার কাছে থাকা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রগুলোই সিটের সামনে থাকা স্ক্রিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যাত্রীদের অখুশি না করে, টাকা বাঁচানোর বেশ সুন্দর বুদ্ধি। একটা মোবাইল, ট্যাবলেট অথবা ল্যাপটপ তো এখন সবার হাতেই থাকে!

http://hongrie-gourmande.com/frensis/1147 দিল্লীর এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হতে রাত ১২ টা বেজে গেল। উবার দিয়ে এয়ারপোর্টের কাছেই আগে থেকে ঠিক করে রাখা এক হোটেলে পৌঁছে গেলাম –  এত রাতে অতিথির আগমনে ফ্রন্ট ডেস্কের লোকটাকে বেশ বিরক্ত মনে হল। বেশ কিছুটা সময় ধরে আমাদের পাসপোর্টের ফটোকপি করে, কোন রুম দেবে এই নিয়ে উবু দশ বিশ খেলে একটা চাবি হাতে দিল। লিফটে করে উপরে উঠে বুঝতে পারলাম যে এটা নিতান্তই এক হোটেল নয়, এক আস্ত গোলকধাঁধা! হোটেল সহকারীর সাহায্যে কোনওমতে রুম খুঁজে বের করে, গোসল দিয়ে বিছানায় যেতে যেতে রাত দেড়টা। পরেরদিনের ফ্লাইট সকাল সাতটা পনেরতে। বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হবে সোয়া পাঁচটাতে, ঘড়িতে চারটার এলার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

হোটেল এয়ারপোর্টের কাছেই নিয়েছিলাম – রাস্তার উপরে হওয়াতে ভারি ভারি সব গাড়ি ঘুমের বারটা বাজিয়ে দিল। আধো ঘুম আধো জাগরণে তিন ঘণ্টা মত ঘুমিয়ে ব্যাগ বোঁচকা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। কলকাতা বিমানবন্দর যদি বিশালতার দিক দিয়ে নদী হয়ে থাকে তাহলে দিল্লী বিমানবন্দরকে সাগর বলা যায়। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির নামে এর নাম। এখন শুধু ভারতেরই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ব্যস্ততম বিমানবন্দর। এখানে সবসময়ই মিউজিক বাজতে থাকে। সবচেয়ে মজার হল টয়লেটে ঢোকার মুহূর্ত। সাধারণত অন্য সব জায়গার টয়লেটের গায়ে ‘জেন্টস’ বা ‘লেডিস’ লেখা থাকে, অথবা ছোট্ট করে ছেলে বা মেয়ের চিহ্ন দেওয়া থাকে। এখানে টয়লেটের সামনে বিশাল বড় বর আর বউয়ের ছবি দেওয়া, একদম পাগড়ি আর শাড়ি পরা অবস্থায়। জ্যান্ত মানুষের ছবি – ড্যাবড্যাব চোখে দাঁড়িয়ে আছে, দেখলে ঢোকার আগে কিছুটা সংকোচ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পুরুষ হয়ে জন্মেছি, মেয়ে দেখলেই তো হা করে তাকিয়ে পিছে পিছে যেতে ইচ্ছে করে, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। মেয়ের ছবি দেখে সেখানেই ঢুকে যাচ্ছিলাম, এক জ্যান্ত মেয়ের কটমটে দৃষ্টিতে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসলাম!

coumadin warfarin 4mg দিল্লী থেকে শ্রীনগরের ফ্লাইট এক ঘণ্টা পনের মিনিটের, ভিস্তারা নামের একটা এয়ারলাইন্স। মাত্র দুই বছর হয়েছে এর বয়স, ঝকঝকে এয়ারবাস, দারুণ সুন্দর দেখতে একটা প্যাকেটে খাবার দিল। একদম গরম গরম শর্মা – রুটির ভেতর মাংস, গপাগপ সাবাড় করে দিলাম। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে কাশ্মীরের প্রথম সৌন্দর্য ধরা দিল। প্লেনের জানালা দিয়ে শ্বেত-শুভ্র বরফে ঢাকা পাহাড় দেখতে পেলাম – দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়।

dapoxetine online uk কাশ্মীরে আসার আগে ঠাণ্ডা নিয়ে খুব ভয় ছিল – প্লেন যখন ল্যান্ড করল তখন পাইলটের বদৌলতে জানতে পেরেছিলাম তাপমাত্রা চার ডিগ্রি। দিল্লীর পঁয়ত্রিশ থেকে সরাসরি চার – প্লেন থেকে নামার আগেই মনের বাঘ কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। বেল্ট থেকে লাগেজটা নামতেই সবাই গরম কাপড়-চোপড় বের করে নিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় দেখতে পেলাম যে বিদেশিদের জন্য আলাদাভাবে একটা রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ করা বাধ্যতামূলক। সেই ফর্মে সবার নাম, পাসপোর্ট নাম্বার, হোটেলের ঠিকানা লিখতে লিখতে কাউন্টারের ভেতর থাকা মানুষটার সাথে টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করলাম। তিন দিন আগে মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলতেই তার চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল, মুখটা মাফলারে ঢেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন এক পশলা শুনিয়ে দিল আমাকে।

desyrel tablet 100 mg 30 tb জানুয়ারিতে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম কাশ্মীর যাওয়ার ব্যাপারে। অনেকেই যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত দুইটা বাচ্চা বাদ দিয়েও আট জন গিয়েছিলাম। আট জনের দল ঘোরার জন্য মোটামুটি বিশালই বলাই চলে। আগে থেকেই একটা গাড়ি ঠিক করে রেখেছিলাম – শেভ্রলে টাভেরা নিও এমইউভি। ঠিক আট জনেরই জায়গা হয়। মালপত্র ছাদে বেঁধে দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। চারদিকে ঝকঝকে রোদ। যে শীতের ভয় করছিলাম, সেই শীত রোদের কারনে উধাও। কিছুক্ষণের ভেতর সবাই জামা কাপড় খোলা শুরু করলাম। সঙ্গীদের কারও কারও কাছ থেকে হালকা বকা ঝকাও শুনলাম – এখানে আসার আগে শীতের ভয় দেখিয়ে অনেক গরম কাপড় কিনিয়েছিলাম তাদেরকে দিয়ে। গাড়ি যখন চলা শুরু করল তখন প্রথমবারের মত উপলব্ধি করতে পারলাম যে আমি এখন কাশ্মীরের মাটিতে। যেখানে আসার স্বপ্ন এতদিন ধরে দেখে এসেছি তা বাস্তবে রূপ নিল।

আটজনের থাকার জায়গা একসাথে পাইনি। চার জন করে দুই জায়গায় ছিলাম। এর মধ্যে চারজন ছিলাম লজে, আর চারজন বোটহাউজে। বোটহাউজ কাশ্মীরের একটা ট্র্যাডিশনাল থাকার জায়গা। একটা নৌকার ভেতর থাকার রুম, খাওয়ার রুম, আড্ডাখানা, বারান্দা সব থাকে। নৌকাটা পানিতে ভেসে থাকে কিন্তু নড়াচড়া করে না। জানালা দিয়ে উঁকি দিলেই পানি দেখতে পাবেন আর দেখতে পাবেন অন্যান্য নৌকাগুলোকে, এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।  আমাদের হাউজবোট, লজ আর গাড়ি – এই তিনটিরই মালিক এজাজ নামের বছর তিরিশের এক হাসিখুশি কাশ্মীরি যুবক। আমরা পৌঁছানোর সাথে সাথেই প্রাণখোলা হাসিতে আমাদের বরণ করে নিল। এই হাসি আর আতিথেয়তা পুরো যাত্রা জুড়েই এজাজের কাছ থেকে পেয়ে এসেছি।

ইন্টারনেটের সাথে থাকতে থাকতে এমন অবস্থা হয়েছে যে ইন্টারনেট ছাড়া এখন এক মুহূর্তও থাকতে পারি না। যাই করি না কেন আনমনে পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটু না দেখতে পারলে শান্তি হয় না। মনের অগোচরেই কখন যে ফেসবুক বা মেইলে ঢুকে পড়ি, নিজেই বুঝতে পারি না। এই নেশার খোরাকি জোগাতে কলকাতাতে এক বন্ধুকে বলে একটা প্রি পেইড সিম জোগাড় করেছিলাম ভোডাফোনের – ফোরজি গতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে খুবই মজা পাচ্ছিলাম। শ্রীনগরে নামার সাথে সাথে অচল পয়সার মত আমার সেই সিমও অচল হয়ে গেল। ইন্টারনেট তো দূরের স্বপ্ন, নেটওয়ার্কই নেই! কাশ্মীরে, ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে কেনা প্রি-পেইড সিম কাজ করে না, লোকাল সিম কিনতে হয়। সেই সিমেও নেট থাকে না। ভাবলাম যে লজে যেয়ে তো নেট পাব। সেখানেও হতাশ হলাম। ওয়াই ফাই এর গতি শামুকের থেকেও ধীর গতির। এই আসে-এই যায়। এজাজের কাছে জানলাম যে একটু গণ্ডগোল হলেই সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, মাঝে মাঝে নেটওয়ার্কও। আমাদের এক সঙ্গী তো ইন্টারনেটের অভাবে প্রথম রাতে রীতিমত দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিল। পরে অবশ্য এই নেটওয়ার্ক বিহীন জীবনে আমরা দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।

সবার ব্যাগ একটা রুমে রেখে, এক কাপ চা খেয়ে মিনিট দশেকের ভেতর আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমাদের কাশ্মীর অভিযান শুরু হল সকাল দশটা নাগাদ। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। রাস্তা খুব ভাল না। ঘণ্টা দুয়েক চলার পড় ট্যাংমার্গ পার হয়ে রাস্তার দুপাশে হালকা বরফের দেখা মিলল। গাড়ি এমনভাবে পাক খেতে খেতে উঠছিল যে পেটে মোচড় দিচ্ছিল। মান সম্মান বাঁচানোর জন্য যখন প্রবলভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলাম তখনই সেই চোখ জুড়ান মুহূর্ত এসে হাজির হল। কাশ্মীরে গত পঁচিশ বছরের মধ্যে এবার সব চেয়ে বেশি তুষারপাত হয়েছে। এই তথ্য আগে থেকে জানা থাকলেও চোখের সামনে হঠাৎ ধবধবে সাদা চাদরের আস্তরণ দেখে সবাই একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল। চারদিকে বরফে একদম সাদা হয়ে আছে। গুলমার্গের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর গন্ডোলা বা কেবল কার। এই গন্ডোলা দুইটা জায়গায় নিয়ে যায়। প্রথম স্টপেজ কুংডুরে, এরপর দ্বিতীয় স্টপেজ অপরয়াথে। দুইটার টিকেট আলাদা ভাবে কিনতে হয়, প্রথমটা ৭০০ রুপি আর দ্বিতীয়টা ৯০০ রুপি। কেউ যদি কুংডুরে বরফ না পান তাহলে পরেরটাতে পাবেন। আমরা অবশ্য কুংডুর পর্যন্ত গিয়েই বরফে হাবুডুবু খেয়ে এসেছি।

গাড়ি রাখার একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখান থেকে গন্ডোলাতে যাওয়ার দূরত্ব কিলোমিটার খানেক। সব চিহ্ন মনে হয় এলাকার লোকজন ভেঙ্গে ফেলেছে, তাই কিছু বোঝা যায় না। গাড়ি থামার সাথে সাথেই লোকজন এসে প্যানপ্যান শুরু করল স্লেজ বা বরফের ওপর দিয়ে চলার উপযোগী গাড়ি ভাড়া করার জন্য। সব একেবারে নাছোড়বান্দা। আমরা বরফের ওপর হাঁটার উপযোগী বুট জুতা ভাড়া করে নিজেরাই এগোতে থাকলাম। সমস্যা হল কোথাও কোন চিহ্ন নেই, সাথে ইন্টারনেটও নেই যে দেখব, আর বরফেও সব ঢাকা। হোটেল থেকে এজাজ বলে দিয়েছিল যেখানে নামাবে সেখান থেকে বাম দিকে হাঁটতে। সে অনুযায়ী হাঁটা শুরু করলাম। সাথে সাথেই গাড়ি-ঘোড়া-স্লেজের লোকজন হায় হায় করে উঠল। সবাই বলল যে উল্টো দিকে যাচ্ছি – গন্ডোলাতে যাওয়ার পথ নাকি ডান দিকে। যতই না শোনার ভান করি না কেন, তারা সবাই গায়ের সাথে লেপ্টে থেকে অযাচিত সাহায্য করবেই। অবস্থা বেগতিক দেখে বাধ্য হয়ে একটা গাইড নিতে হল – চারশ রূপিতে। সে যখন আমাদের নিয়ে হাঁটা শুরু করল তখন বুঝতে পারলাম যে এতক্ষণ সবাই উল্টো পথ দেখাচ্ছিল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর গাইডের মুখ খুলল। সে বলতে লাগল যে স্লেজের মালিকেরা তোমাকে ভুল পথ দেখাচ্ছিল। আমার তখন মাথা গরম – বললাম যে তুমিও তো সেখানে ছিলে, আমাদেরকে বললে না কেন। উত্তর এল, এই কথা বললে ওরা নাকি থাপ্পড় মারত। ওখানে সবাই বলেছিল – টিকিট কাটার লাইনে নাকি অনেক ভিড় – গাইড না নিলে টিকেট পেতে অনেক সময় লাগবে। আমরা যখন টিকেট কাটার কাউন্টারে গিয়ে পৌছালাম তখন সেখানে কাক পক্ষীও নেই। একই দিনে দ্বিতীয় বারের মত ফাঁকিবাজির শিকার হলাম। এসব কারনে মনে সামান্য তিক্ততা ছিল – গন্ডোলাতে পা দেওয়ার সাথে সাথে সব উধাও হয়ে গেল। নিচে বড় বড় পাইন গাছ আর সাদা বরফ। গরমের দেশের মানুষ আমরা, জীবনে কখনও দেশে কোনদিন বরফ পড়তে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, পৃথিবীর আবহাওয়া যেভাবে উল্টে পাল্টে যাচ্ছে সেটা মাথায় রেখেও বলতে পারি বাংলাদেশে হয়তো কোনওদিনও বরফ পড়বে না। তাই মনে হয় বরফ দেখার উত্তেজনাটা আমাদের একটু বেশিই হয়।

গন্ডোলার ভেতর থেকে চারদিকের ছবি তুলতে তুলতে আমরা প্রথম স্টেশন কুংডুরে পৌঁছে গেলাম। বিশাল বড় জায়গা, পুরোটাতেই বরফ জমে আছে। আমরা পিচ্ছিল বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সামনে এগুতে লাগলাম। লোকজন স্কিইং প্রাকটিস করছে। অনেকে আবার যান্ত্রিক স্লেজ গাড়িতে করে একটু দূরে ঘুরে আসছে। আমাদের মত বেশিরভাগ মানুষই অবশ্য বুঝতে পারছে না কি করবে। তাই কেউবা বরফে বসে পড়ছে আবার কেউবা একটু গড়াগড়ি খেয়ে নিচ্ছে। দূরে আবার পাহাড়ও দেখা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘ এসে এক অদ্ভুত আলো-আঁধারের খেলা তৈরি করছে পাহাড়ের চূড়ায়। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা হোটেলের কাছে এসে চেয়ারে বসলাম। সেই চেয়ার আবার আমাদের ভারে বরফের ভেতর ডুবে গেল। উঠে সেই চেয়ার বরফ থেকে তুলে আবার বসতে না বসতে ধরাম করে সবাই বরফের ওপর। সবার হাসি আর আনন্দধারার ভেতর চারদিক দেখতে দেখতে সময় কাটতে লাগল। এ যেন অকারণে হেঁটে আর হেসে ওঠার দিন! সহযাত্রীর কাশ্মীরি পোলাও থেকে কিছুটা ভাগ নিয়ে আর নিজের অর্ডার দেওয়া ভাত-মুরগি পেটে পড়ে ঝালে নাস্তানাবুদ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল। ওখান থেকে উঠতে ইচ্ছে না করলেও উঠতে হল – তিনটার পর গন্ডোলা বন্ধ হওয়া শুরু করে। নিচে নেমে এসে জুতাগুলো ফেরত দিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে মুখ ঘুড়িয়ে পাহাড়গুলোর দিকে তাকালাম। সকালে যে রূপ দেখেছিলাম তার সাথে বিকেলের রূপের তারতম্য চোখে পড়ল। এ যেন একটা মানুষের বিভিন্ন বয়সের আলাদা আলাদা সৌন্দর্যের মত।

গুলমার্গ থেকে শ্রীনগর ফেরার পথে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে নি। বিশ ঘণ্টা আগেও আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে ছিলাম – এর মাঝে এতকিছু ঘটে গেল, শরীর আর নিতে পারছিল না, গাড়িতে তাই একটা নিস্তেজ ভাব এসে গিয়েছিল, সবাই প্রায় ঘুমে ঢুলুঢুলু, এর মাঝে রাস্তার পাশের আপেল বাগান কিছুটা উত্তেজনা ছড়াল আমাদের মাঝে। এজাজের লজে আমাদের চারজন নেমে গেল, সুটকেস গুলো নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম আবার। অল্প কিছু পথ পাড়ি দিয়ে চলে এলাম জিলাম নদীর ওপর রাখা হাউজবোটে।

এর আগে সুইডেনে এক ইয়টে রাত কাটানোর সৌভাগ্য হলেও হাউজবোট এবারই প্রথম। একটা সরু সাঁকোর ওপর দিয়ে হেঁটে বোটে ঢুকলাম। জুতা খুলে সরু একটা প্যাসেজের ভেতর দিয়ে রুমে ঢুকেই মনটা খুশীতে নেচে উঠল। রাজকীয় ডিজাইনের খাট, মখমলের মত কার্পেট। সুন্দর কাঠের ড্রেসিং টেবিল। সাথে লাগোয়া বাথরুম, কাঠ যেন ভিজে না যায় তাই টিন দেওয়া। কল ঘুরালেই গরম পানি পাওয়া গেল। সবচেয়ে সুন্দর অংশটা হল রুমের জানালা। পর্দা সরাতেই স্রোতস্বিনী নদী দেখতে পেলাম। এই সেই জিলাম নদী যেটা পাঞ্জাবের পাঁচটা নদীর ভেতর সবচেয়ে পশ্চিমের নদী। বলা হয়ে থাকে ‘জল’ আর ‘হাম’ মিলে ‘জিলাম’ – জল মানে বিশুদ্ধ পানি আর হাম মানে বরফ। হিমালয়ের বরফ থেকে ভেসে আসা বিশুদ্ধ পানির নদী বলেই এর নাম জিলাম।

রাত আটটার দিকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বাইরে বের হওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। বাইরে কিছুটা পা ফেলে দেখলাম চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার – রাস্তা একেবারে ফাঁকা। কারফিউ চলছে কিনা বুঝতে পারলাম না। অচেনা শহরে ঝুঁকি না নিয়ে রুমে ফিরে আসলাম।   হোটেলের ভাড়ার সাথে রাতের খাবার আসার কথা ছিল, টিফিন কেরিয়ারে সেই খাবার এসে হাজির। খাওয়ার টেবিলের ওপর কাঁচ বসানো, আর তার নিচে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা রাখা। বাংলাদেশের টা নেই বলে, বের করে দিলাম। টেবিল আর চেয়ার গুলো খুব সুন্দর কারুকাজ করা। খাবার খোলার সাথে সাথেই আমরা ক্ষুধার্ত বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়লাম। গরম ভাত, রুটি, বরবটি, মুর্গি আর ডাল – কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব সাবাড়। হোটেলের লোকটা মনে হয় কিছুটা লজ্জাই পেল। আমাদের আবার চক্ষু-লজ্জার বালাই নেই, ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বিছানার ভেতর গরম লেপের ভেতর ঢুকে পড়লাম। শেষ হল ভূস্বর্গে আমাদের প্রথম দিনটি।

ভোরবেলা মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙ্গে হালকা গরম কাপড় গায়ে চাপিয়ে একটু বাইরে বের হলাম। আমাদের হাউজবোটটা রাস্তার পাশেই একটা ছোট্ট পার্ক ঘেঁষা ছিল। সেই পার্কে অনেকেই জগিং করছে। আমি বের হয়ে আমার দেড় বছরের ছেলেকে নিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। সেতো বেজায় খুশী। একটু পরপর ‘পাপি-পাপি’ বলে দৌড়ে যাচ্ছে। একসাথে এতগুলো ‘পাপি’ মানে পাখি দেখার সৌভাগ্য তো ঢাকা শহরে বেচারার প্রতিদিন হয় না। ব্রেড, অমলেট আর গরম গরম চা খেয়ে আমাদের দ্বিতীয় দিনের যাত্রা শুরু হল। আজকে যাব পাহালগাম। শ্রীনগর থেকে পাহালগাম আটাশি কিলোমিটার দূরে। দূরত্ব বেশি হলেও, রাস্তা বেশ ভাল, আড়াই ঘণ্টার ভেতরই পৌঁছে যাওয়া যায়। হাসি-আনন্দে যাত্রা চলছিল। একটা গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে বাজার দেখতে পেলাম। একটা টং মত বেকারি দোকান দেখে গাড়ি থামালাম। দৌড়ে যেয়ে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট আর কেক কিনলাম। তার পাশের দোকানেই ছিল বিভিন্ন ধরণের তেলে ভাজা খাবার। সেখানে কেজি দরে বিশাল পরোটা বিক্রি হচ্ছিল। পরোটার ভেতর আবার খুবই মজার হালুয়া দেওয়া। আমার হাতে বিস্কিট আর আমার সঙ্গীদের হাতে বিশাল পরোটা আর হালুয়া – গাড়িতে ওঠার পর বেশ ভাল ধরণের হাউ-কাউ লেগে গেল। কেউ থু বলে ফেলে দিতে চাইল আবার কেউ দেখি গোগ্রাসে গিলতে লাগল। আমি নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় দলে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল শুকনো খাবারের দোকানে। দোকান জুড়ে সাজিয়ে রাখা পেস্তাবাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট, কিসমিস, জলপাইয়ের তেল, জয়ত্রী ফল আরও কত কিছু! আমার মত ছেলের পক্ষে তো আর সব কিছুর নাম জানা সম্ভব না, তবে সাথে থাকা মেয়েদের চিত্ত-চাঞ্চল্য দেখে বুঝতে পারলাম যে বেশ ভাল এক খনির ভেতর তারা এসে পড়েছেন। এই বাদামেরও আবার বিভিন্ন ধরণের কোয়ালিটি আছে, কোনটা হাজার রুপির, কোনটা পাঁচশ রুপির। কিছু জিজ্ঞেস করলেই, মেশিন গানের মত কথার তুবড়ি ছোটায়, কিছুই বুঝতে না পেরে হ্যাঁ-হু করে গেলাম। এর মাঝে শুরু হল দোকানদারের জাফরন (Saffron) বিষয়ক লেকচার। জাফরনের ফুল বছরে একবারই ফোটে, এক কেজির দাম নাকি আড়াই থেকে তিন লাখ রুপি। একটা বাক্সে করা কিছু লাল লাল রঙের জিনিসের দাম যে তিন লাখ রুপি হতে পারে এটা ভেবেই মাথা ঈষৎ ঘুরে উঠল। বুঝলাম যে এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা আমার মত ছোট পকেটের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর না। তাও কি সে দোকানদার থামে! সে জাফরন বিক্রির চেষ্টা করেই যাচ্ছে, আর আমি রেডি হয়ে আছি অবস্থা বেগতিক দেখলে দৌড়ানোর জন্য! এই জাফরনের ভুত কাশ্মীরি গাইডের মতই তাড়া করে ফিরেছে পুরো কাশ্মীর জুড়ে, আর সাথে কাশ্মীরি শাল – ঢাকাতে শাল পরার মত শীত যে বছরে দুই এক বারের বেশি পড়ে না এইটা ‘নারীকুলের’ মাথায় কোনভাবেই ঢোকাতে পারলাম না। নদী যেমন সমুদ্রে যেয়ে হাজির হয়, তেমনি আমাদের মেয়েরাও গুটি গুটি পায়ে শালের দোকানে – একটু চোখের আড়াল হলেই হয়েছে! কি যে যন্ত্রণা!

কাশ্মীরে এক ধরণের চা পাওয়া যায় – ‘কাহওয়া’ – ওদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। অনেকটা কমলা হলুদ রঙের, ভেতরে বাদাম দেওয়া থাকে। রঙটা মুখে না আনতে পারা বিশেষ এক জিনিসের মত হলেও চা টা মন্দ না। তবে এই চা খাওয়ার পর সবারই মনে হত, আরে চা তো খাওয়া হল না! চা মাত্রেই বাঙ্গালির কাছে দুধ চা বা রং চা, এদুটোর একটা পেটে না পড়লে কি আর হয়! এইজন্য প্রতিবার কাহওয়া খাওয়ার পর আরেকবার চা সবারই খেতে হয়েছে। বাদাম-কিসমিস কিনে, কাহওয়া-চা খেয়ে আবার গাড়ির চাকা ঘোরা শুরু করল।

কিছুক্ষণ পরই কিন্তু ল্যান্ডস্কেপ পুরো অন্যরকম হয়ে গেল।  একপাশে পাহাড়, আর আরেকপাশে গম্ভীর ভাবে বয়ে চলা লিডর নদীর শব্দে বুঝতে পারলাম পাহালগামের কাছে চলে এসেছি। আগের দিন বরফের রাজ্যে ঢুকে পড়েছিলাম। আজ চলে এলাম এক স্বপ্নিল উপত্যকায়। চারদিক রোদে ঝলমল করছিল – আর দূরে রং পেন্সিলে আঁকা পাহাড়। গুলমার্গের মত পাহালগামেও বাইরে থেকে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে ঘোরা যায় না। স্থানীয়রা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যে আর্মিরা ছাড়া নিজের গাড়ি নিয়েও এখানে কেউ ঘুরতে পারবে না। আমাদের গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই আবার গাইডরা ঘোড়া নিয়ে হাজির হল। পাশেই একটা বড় সাইনবোর্ডে বিভিন্ন জায়গার ছবি আঁকা আর সেই সমস্ত জায়গার নামসহ সেখানে যাওয়ার ভাড়ার তালিকা দেওয়া – পাহালগাম ভ্যালি, বাইসারান, কাশ্মীর ভ্যালি, ওয়াটার ফল, কুনমার্গ, বেতাব ভ্যালি সহ আরও অনেক গালভরা নাম। তো এসব জায়গায় যেতে কত লাগবে জিজ্ঞেস করাতে বলে উঠল সাত হাজার রুপি। হালকা কথাবার্তা বলে ছয় হাজারে নামিয়ে আমরা যখন আট জনকে ডাকছি ঘোড়াতে ওঠার জন্য তখন আমার মনে একটু সন্দেহ হল। জিজ্ঞেস করলাম, আট জনের জন্য জন্য ছয় হাজার তো? সাথে সাথে উত্তর, না, এক জনের জন্য ছয় হাজার, আট জনের জন্য আটচল্লিশ হাজার। সবে তৃষ্ণায় পানি খাওয়া শুরু করেছিলাম – যে বিষম খেলাম এই কথা শুনে তা পাঠকরা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন। এবার শুরু হল কঠিন মুলামুলি। ছয় হাজার টাকা থেকে আমরা চারশ টাকায় নেমে গেলাম। ওরাও তো অট্টহাসি দিয়ে ‘তফাৎ যাও’ শুনিয়ে দিল, আমরাও যখন ‘তফাতে’ যাওয়া শুরু করলাম তখন আবার অন্য একজন এসে বলল যে তোমাদের সম্মানে পাঁচশ টাকা কমালাম – পাঁচ হাজার পাঁচশ দিও। আমরাও তাদের সম্মানে একশ টাকা বাড়িয়ে পাঁচশ করলাম। এভাবে রীতিমত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতি জন এক হাজার টাকায় রফা হল! এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আটটা ঘোড়া, চারটা সহকারী সহ এসে হাজির। এগুলোকে ঘোড়া না বলে হৃষ্টপুষ্ট গাধা বললেও ভুল হবে না। আমার তো মনে হচ্ছিল যে আমি এর উপরে উঠলে না আবার এটা মরে যায়। এটা ভাবার যুক্তিসঙ্গত কারনও আছে। সারাজীবন শুনে এসেছি ঘোড়া নাকি দাঁড়িয়ে ঘুমায়। একটু আগেই দেখেছি যে একটা ঘোড়া হাত পা টানটান করে শুয়ে আছে – দেখে মনে হচ্ছে একটুও নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। আমি যখন মোটামুটি নিশ্চিত যে ওটি মরে গিয়েছে তখনই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। কে জানে সেই ঘোড়াই আমাকে টেনে নেবে কিনা!

ঘোড়ার ওপর হাঁচরে পাঁচরে কোনমতে উঠে পড়লাম – আমার সামনে আমার পৌনে দুই বছরের ছেলে ঝুলে আছে। ঘোড়া হাঁটা শুরু করল আর আমি শক্ত হয়ে বসে রইলাম আমার ছেলেটাকে ধরে। একদিকে ভয় মিশ্রিত আনন্দ অন্য দিকে দম বন্ধ করা সৌন্দর্য, এই  মিশ্র অনুভূতি নিয়েই সামনে এগুতে লাগলাম। পথের এক পাশে অনেক বড় বড় পাইন গাছ দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ি রাস্তার উঁচু নিচু পথ দিয়ে যেতে যেতে অনেক বাড়ি ঘর চোখে পড়ল। দরজা – জানালা আর উঠান থেকে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হাত নাড়তে লাগল। ঘোড়ার ওপরে থাকার কারনে ছবি তুলতে পারছিলাম না বলে একটু মন খারাপ লাগছিল। নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিলাম রাজা হিসেবে কল্পনা করে। রাজারা তো আর ছবি তুলতো না! নাম না জানা এক জায়গায় এসে থামলাম। কাশ্মীরকে কেন অনেকেই সুইজারল্যান্ডের সাথে তুলনা করে তার কিছুটা ধারণা পেলাম। জায়গাটা আসলে প্রায় সমান সবুজ মাঠ। মাঝে মাঝে বড় পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদিক ওদিক গাছ আর জঙ্গল দেখা যাচ্ছে। আর পাশেই বরফে ঢাকা পাহাড় চোখের সামনে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়ান। অনেকটা গর্তও’লা বাটির মত – bowl shaped। সবাই মিলে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম – বিভিন্ন কম্বিনেশনে। এমন জায়গাতেই হয়তো অনেক সিনেমার শুটিং হয়েছে – আমাদেরও কয়েক মুহূর্তের নায়ক নায়িকা হতে দোষ কী?

এখানেই দিনটি কাটিয়ে দিতে পারলে মন্দ হত না, কিন্তু আমরা তো অনেকগুলো ‘স্পট’ দেখার জন্য ঘোড়া ভাড়া করেছি। তাই আবার কায়দা করে ঘোড়ার পিঠে বসলাম, এবার মনে হয় একটু সহজ বলে মনে হল। কিছুটা পথ পেরোতেই দূর থেকে গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে আসতে লাগল। কি আছে সামনে এটা আন্দাজ করতে না করতেই চোখের সামনে পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র স্রোতের জলধারা এসে হাজির। বড় বড় পাথরের মাঝখান দিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে। আমি কয়েকদিন আগে অন্নপূর্ণা বেইজক্যাম্পের ট্রেকিং করার সময় এমন অনেকগুলো জায়গার ভেতর দিয়ে গিয়েছি, তাই খুব পরিচিত দৃশ্য বিনা পরিশ্রমে দেখতে পেয়ে ভাল লাগছিল। কিন্তু আমাদের দলের অনেকের কাছেই এটা একেবারেই নতুন। তারা সবাই ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছোট বাচ্চার মত ছোটাছুটি করতে লাগল। একটা ছোট সেতু ছিল, চোখের পলকে পার হয়ে সবাই এক একটা পাথরকে সিংহাসন বানিয়ে বসে পড়ল। এই পানিতে পড়লে যে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এটা বলার বৃথা চেষ্টা করলাম।  আমার এই কথা জলপ্রপাতের আওয়াজ আর সবার উচ্ছ্বাসের ভেতর হারিয়ে গেল। পানি একেবারে বরফের মত ঠাণ্ডা, হাত দিলেই জমে যাওয়ার মত অবস্থা। আমাদের সাথে আসা ঘোড়ার সহিসদের এগুলোতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, তারা সিগারেট খাওয়া শেষ করে আমাদেরকে তাড়া দিতে লাগল।

যেদিক থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম সেখানে আবার ফিরে যেতে লাগলাম। এতক্ষণ ছিল ওঠা, এবার নামার পালা। ঘোড়ার মাতাল পা ফেলা দেখে একবার মনে হল হেঁটে গেলে খারাপ হত না। কিন্তু ভাড়া যখন করেছি তখন কি আর নামি! এদিকে আমার ছেলে ঘোড়ার সামনে বসে ঘুমিয়ে কাদা। উল্টো দিক দিয়ে আসা অন্যান্য পর্যটকরা আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় চিৎকার করে জানিয়ে দিতে ভুলছে না। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে এসে নামলাম। আমি ভেবেছিলাম যে বিশ্রাম নিতে থেমেছি, সামনে আরও কোথাও যাব। একটু পর বুঝতে পারলাম যে আমাদের যাত্রা শেষ। মাত্র দুই ঘণ্টায় এতগুলো জায়গা দেখে ফেলাতো প্রায় অসম্ভব। সবাই মিলে হই-হই করে উঠলাম। নিশ্চয়ই সব জায়গায় আমাদেরকে নিয়ে যায়নি। ওদের সাথে অবশ্য তর্ক করে লাভ নেই, হড়বড় করে সব জায়গার নাম বলে বলল যে এগুলো সব পথেই ছিল। যেহেতু জায়গাগুলোর নাম জানিনা আর কোন সাইনবোর্ডও নেই তাই আর ঝগড়া করলাম না, যেটুকু দেখেছি তাতেই তো আসলে মন ভরে গিয়েছে।

ঘোড়ার বিটকেলে গন্ধ গায়ে নিয়ে একটা হোটেলে ঢুকলাম দুপুরের খাওয়ার জন্য। গুজরাটি এক হোটেল। বিভিন্ন ধরণের থালি পাওয়া যায়। ১৩০ টাকায় ছোট থালি, ১৭০ টাকায় বড় থালি। পাঁপড়, ভাত, রুটি, ডাল, সবজি, লাচ্ছি আর সাথে এক্কেবারে গরম গরম গোলাপজাম! সব খেয়ে শেষ করা প্রায় অসম্ভব। গোলাপজামটা এতই ভাল লাগল যে আরও দুইটা অর্ডার দিয়ে গপাগপ খেয়ে ফেললাম। জিভ সামান্য পুড়ল, কিন্তু এরকম গরম কড়াই থেকে নামানো মিষ্টি তো আর প্রতিদিন খাওয়ার সৌভাগ্য হয় না!  খাওয়া শেষে আশেপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করে বেড়ালাম। পাশেই একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড ছিল। ওখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি সহ আরও কিছু জায়গায় যাওয়া যায়। আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না তাই আর ও পথ মাড়ালাম না। গাড়িতে করে শ্রীনগর পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল ছয়টা। মাঝখানে লিডর নদীতে বিছানো পাথরের ওপর বসে কিছুক্ষণ চারদিকের সৌন্দর্য উপভোগ করে ভুলিনি।

শ্রীনগরে পৌঁছেই সরাসরি সেই রোমান্টিক ডাল লেকে চলে গেলাম। ভেনিসে সফর যেমন গন্ডোলাতে না উঠলে পূর্ণ হয়না, তেমনি শিখারাতে না উঠলে নাকি কাশ্মীর সফরও পূর্ণ হয় না। ভেনিসে গিয়ে আমার গন্ডোলাতে চড়া হয়নি, হেঁটে হেঁটেই ভেনিস দেখেছিলাম, কিন্তু শিখারায় ওঠার সুযোগ এবার আর ছাড়লাম না। ডাল শব্দের কাশ্মীরি অর্থ লেক, তাই একে শুধু ডাল বলাটাই ভাল। ডাল অনেক বড় – প্রায় পনের কিলোমিটার। এর বেশ কিছুটা অংশ জুড়েই পর্যটকদের থাকার জন্য হাউজবোট আছে। হাউজবোটগুলোর বেশিরভাগই যেহেতু পানির মাঝখানে তাই, ওগুলোতে যেতে শিখারা লাগে। শিখারা হল একধরণের বিশেষ নৌকা যেখানে নরম মখমলের মত আরামদায়ক বসার জায়গা আছে। বসার জায়গাটা এতই বিশাল যে শুয়েও পড়া যায়। বৈঠাটার শেপ হার্টের মত, মাঝিরা বিশেষ এক রকমের জামা পরে থাকে। আট জনের জন্য দুইটা শিখারা আটশ টাকা দিয়ে ভাড়া করে উঠে পড়লাম। রঙ্গিন হাউজবোটগুলোর ছায়া পড়ে পানিও রংচঙে হয়ে উঠেছিল – সেটা আবার মৃদু কাঁপুনিতে এক অন্যরকমের রং তৈরি করছিল। অদূরেই বরফে আবৃত পির প্রাঞ্জল পাহাড় দেখা দিচ্ছে। এভাবেই চারদিক মুগ্ধ হয়ে যখন দেখছিলাম তখনই, রীতিমত উড়ে এসে কয়েকটি শিখারা আমাদেরকে ঘিরে ধরল। কেউবা ফল বিক্রি করতে চায়, কেউ বা ‘এক নাম্বার’ জাফরন, কেউবা আবার ফটো না তুলে থামবেই না, কেউ কেউ আবার কাঠের তৈরি ছোট নৌকা নিয়ে হাজির। সবার হাত থেকে কোনমতে ছাড়া পেয়ে আরেকটু গভীরে ঢুকলাম। দুইধারে ভাসমান বাজার বা ফ্লোটিং মার্কেট। পানির ওপর দোকান ভাসছে, জামা-কাপড়, শাল, কার্পেট এগুলোর দোকান। কেউ কিছু কিনছে বলে আমার অন্তত মনে হল না। তবে দোকানদাররা আড্ডায় মশগুল। এই ডাল লেকই শীতকালে সম্পূর্ণ জমে যায় মাইনাস এগারো ডিগ্রি তাপমাত্রায়। তখন এখানে নৌকার বদলে স্কি করতে আসে লোকজন। আস্তে আস্তে সন্ধ্যে গড়াতে লাগল। সূর্যের পড়ে আসা আলো, হাউজবোটগুলোর ঝলমলে লাইট আর তার নিজের গায়ের কারুকার্যময় রঙয়ের মেলা পানিকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে এক মোহময় আবেশের জন্ম দিল। সেই ঘোরকে সঙ্গে নিয়েই দিনটি শেষ করলাম। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে ডাল লেকের এই বাণিজ্যিক চেহারা ছাড়া অন্য চেহারাও আছে।  লেকের এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে এই হাউজবোটগুলো নেই, শান্ত, দীর্ঘ লেকে বিরক্ত করার কেউ থাকবে না, শুধু আপনিই প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে পারবেন। অনেকে ডাল লেকের বিকল্প হিসেবে থাকার জায়গা হিসেবে নাগিন লেককে বেছে নেয়। নাগিন লেক শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে, আর আসলে এটা ডাল লেকেরই একটা অংশ।

রাতে বোটে ফিরে দেখি আমাদের জন্য ল্যাম্বের মাংস এসে হাজির – কাশ্মীরি রান্নায়। আগের রাতের মতই আজকের খাবারও মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। খেয়ে দেয়ে নড়া চড়া করাই কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল। এবার রাস্তার পাশ থেকে কেনা আঙ্গুর, আম, আর কিউয়ি ফল খাওয়ার মহান দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিলাম।

তৃতীয় দিন সকালে রওনা দিলাম সোনামার্গের পথে যাকে সবাই মিডোও অফ গোল্ড বলে ডেকে থাকে। শ্রীনগর থেকে সোনামার্গের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার আর পৌঁছাতে সময় লাগে দুই ঘণ্টার মত। আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর আবার বাজে কিছু সময় কেটেছে এইদিন। সোনামার্গ অনেক বেশি সুন্দর – একেবারে দম বন্ধ হওয়ার মত সুন্দর। কিন্তু ওখানকার লোকজন কিছু না কিছু নেওয়ার জন্য চীনে জোঁকের মত লেগে থাকে – প্রায় হাতাহাতি হওয়ার দশা হয়েছিল। কেজিখানেক বড় বড় আপেল রাস্তার পাশ থেকে কিনে আমাদের যাত্রা শুরু হল। কিছুদূর পরপরই চোখ ধাঁধানো হলুদ রঙের সরিষা ক্ষেত আর পেছনে যথারীতি পাহাড়। এরকম কয়েকটা ক্ষেত পার হয়ে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না। গাড়ি থামিয়ে কয়েকটা ছবি তুলতেই হল!

শ্রীনগর থেকে সোনামার্গের রাস্তাটাই শেষ পর্যন্ত লেহ চলে গিয়েছে। পুরো রাস্তা ৪৩৪ কিলোমিটারের। এই পথে এত বেশি বরফ পড়ে যে শীতকালে রাস্তাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গরমে ধাপে ধাপে রাস্তা থেকে বরফ সরিয়ে যানবাহনের চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয়। আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, অর্থাৎ ১৬ এপ্রিলই শ্রীনগর থেকে সোনামার্গের রাস্তাটা খুলে দেওয়া হয়। সোনামার্গের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই গাড়ির ভেতরে সোরগোল পড়ে গেল। রাস্তা যে বরফে ঢাকা ছিল এতদিন এটা খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। রাস্তার দুইপাশে দুই মানুষ সমান উঁচু বরফ জমে আছে। মনে হচ্ছিল আমরা বরফের টানেলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি – শুধু উপরে নীল আকাশ দিয়ে ঢাকা। টানেলের ভেতর দিয়ে বের হয়েই একপাশে পাচ্ছিলাম প্রচণ্ড শব্দে বয়ে চলা সিন্ধ নদী। বরফ গলতে শুরু করেছে, এমন সময়ের তেজি নদী!

গাড়ি আমাদেরকে একেবারে থাজিওয়াস গ্ল্যাসিয়েরের কাছেই নিয়ে গেল। গুলমার্গে আর কি বরফ দেখেছিলাম – বরফ হল সোনামার্গে! একেবারে সাদাতে সাদাটে ভরা। আর দূরে সোনালী পাহাড় ঝিলিক দিচ্ছে। কয়েকদিনের ট্যুরে আমরা এখন একটু অভিজ্ঞ। প্রথমেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম যে জুতা ভাড়া করব না। কিন্তু স্লেজ নেওয়ার জন্য লোকজন পিছু ছাড়ে না। গত ছয়মাস নাকি সব কিছু বন্ধ ছিল, আয়ের কোনও পথ ছিল না – এইসব ইমোশনাল ব্লাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে ওনাদেরকে সাহায্য করার জন্য কিছু স্লেজ ভাড়া করে পরে অনেক পস্তাতে হয়েছে – সে গল্প এখন থাক।

বরফের ওপর সাধারণ জুতা পরে হাঁটার দুইটা বিপদ টের পেলাম। প্রথমত – শুধু পিছলে যাচ্ছিলাম, কখন যে আছাড় খেয়ে বুড়ো বয়সে হাত পা ভাঙ্গি এই ভয়ে ছিলাম – কেন যেন মনে হচ্ছিল যে পড়ে গেলে কলার বোনটা আগে ভাঙ্গবে – এত কিছু থাকতে কলার বোন কেন কে জানে? দ্বিতীয়ত – মাঝে মাঝে নরম বরফের ভেতর পা পুরোপুরি ডুবে যাচ্ছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাঁটু পর্যন্ত ভেতরে। আমার কোলে আবার আমার ছোট ছেলে। তাকে নিয়ে এক হাঁটু বরফে ডুবে আমি সামনে ঝুঁকে কোনমতে তাল সামলাচ্ছি, আর সাথে সাথে মশার মত পিনপিন করতে থাকা গাইড – সমানে হিন্দিতে বকেই যাচ্ছে। অনেক কষ্টে উবু হয়ে গেঁথে যাওয়া পা’টা তুলতে না তুলতেই আবার অন্য পা’র ও একই অবস্থা। এহেন যুদ্ধ করতে করতে গলা গেল শুকিয়ে। চারদিকে বরফ হলেও চোখ ধাঁধানো রোদ্দুর। এমন বরফে হাঁটতে যেয়ে এরকমই রোদ্দুরেই মনে হয় অন্ধ হয়ে যায় অভিযাত্রীরা। আমরা অন্ধ না হলেও কদিনপর সাপের মত চামড়া উঠে গিয়েছিল সানবার্নড হয়ে – কেউই রেহাই পাই নি। নিচ থেকে অনেকটা ওপরে ওঠার পর মনে হচ্ছিল দূরের ওই পাহাড়ে চলে যাই। হাত ছোঁয়া দূরত্বে হলেও যে যেতে দুয়েকদিন লাগবে এটা নিশ্চিত। ওপরে উঠে একটু থিতু হয়ে বসলাম। চারদিকেই খেলার মাঠ হয়ে আছে – সবাই মোটামুটি পাগলের মত খেলছে। নিচে নামার সময় একটা খাঁড়া জায়গা বেছে নিলাম। তারপর বসে পড়লাম বরফে। দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ইঞ্জিন চালু করে নিলাম। সাই সাই করে নিচে নেমে আসলাম বরফে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে – প্যান্টটা পুরোটাই ভিজে গেল কিন্তু লাখ টাকার অভিজ্ঞতা তো হল! ট্যুরে অনেকে অনেক বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও সোনামার্গ যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল এই বিষয়ে সবাই একমত ছিলেন।

ফেরার পথে সকালে কেনা ঢাউস সাইজের আপেল গুলো দিয়ে দুপুরের খাবার সারার চেষ্টা করলাম – কিন্তু আপেলগুলো অর্ধেক খেয়ে আর খেতে ইচ্ছে করল না। এমনসময় রাস্তার পাশে একটা দোকান দেখতে পেয়ে সবাই খুশী হয়ে উঠলাম। একদম টংয়ের দোকান – প্রায় কিছুই নেই। কিন্তু ওখানে আমরা ম্যাগি নুডলস আবিষ্কার করলাম। দোকানদারকে বললাম পানিতে সিদ্ধ করে দিতে। অল্প কয়েকটা অর্ডার দিয়েছিলাম – পেটে খিদে, এই ম্যাগিই অমৃতের মত লাগল। এরপর হুড়মুড় করে আরও কয়েকটা অর্ডার দিতে হল। সাথে চা খেয়ে দুপুরের খাবার শেষ হল। শ্রীনগর ফেরার পথে ক্রিকেট ব্যাটের ফ্যাক্টরি দেখতে পেলাম। ছাদে সারি সারি ব্যাট শুকানো হচ্ছে। এখানকার ব্যাট নাকি বেশ বিখ্যাত। দিনের আলো তখনও শেষ হয়ে যাইনি। শ্রীনগরের টিউলিপ বাগানে যাব বলে ঠিক করলাম।

টিউলিপ বাগানে ঢোকার মুখে একটা ইলেক্ট্রনিক বোর্ডে দেখলাম লেখা “আজকে আশি শতাংশ ফুল ফুটেছে”। আমরা যখন যাই তখন টিউলিপ ফেস্টিভাল হচ্ছিল। ভেতরে পা দেওয়ার সাথে সাথেই মনে হল কোনও এক রঙের রাজ্যে ঢুকে পড়েছি! থরে থরে সাজানো টিউলিপ ফুল চারদিকে – কী রং নেই সেখানে – লাল, কমলা, হলুদ, বেগুনি, সাদা! এক লালের ই যে কত শেড দেখলাম। এশিয়ার সবচেয়ে বড় টিউলিপ বাগানে টিউলিপ ছাড়াও ড্যাফোডিলও চোখে পড়ল। বাগানের পেছনে ব্যাকড্রপের মত ঝুলছে জাবারওয়ান রেঞ্জের পাহাড়, ঝর্ণার পানি আর এক পাশে আবার ছোট্ট একটা লেক। অনেকগুলো আয়তক্ষেত্রের মত বাগান, মাঝখান দিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা আছে। সন্ধ্যে নামার একটু আগে গিয়েছিলাম, আলো তখন কমে এসেছিল, কিন্তু এত রং থাকলে আলোর কী দরকার?

বাগান থেকে বের হয়েই দেখি কাশ্মীরি ফালুদা বিক্রি হচ্ছে। যথারীতি লোভ সামলাতে ব্যর্থ হলাম। দ্বিতীয় গ্লাস খেতে পাড়লে মন্দ হত না তবে এবার এক গ্লাসেই সন্তুষ্ট থাকলাম। এমন সময় কয়েকজন বলে উঠল যে কাশ্মীরে এসেছি কিন্তু কাবাব খাব না তা কি করে হয়! আমাদের ড্রাইভারের নাম ছিল মুজাফ্‌ফর। সন্ধ্যা নেমে গিয়েছিল – এখন হোটেলে ফেরার সময়। মুজাফ্‌ফর এর মন মেজাজ সারাদিনই একটু খারাপ থাকে। কিন্তু হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলে যে আবার রিচার্জড হয়ে যায়। তখন সে বেশ হাসি-ঠাট্টা-গল্পে মশগুল থাকে। তো তাকে কিছু রিচার্জ করে দিয়ে একটা কাবাবের দোকানে নিয়ে যেতে বললাম। তিনি এক আলিশান দোকানের সামনে গাড়ি রাখলেন। আমরা অবশ্য এটা চাইনি, একেবারে খাঁটি লোকাল কিছু চাইছিলাম। এটা বলতেই আরও কিছুদূর চালিয়ে একেবারে রাস্তার পাশের এক ভ্রাম্যমাণ দোকানে নিয়ে গেলেন তিনি। দেখেই বুঝলাম যে পেট খারাপ হয়ে যাবে। মুজাফ্‌ফর যে মোক্ষম এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন সেটা আর মিনিট দশেকের ভেতরেই টের পেলাম। গরম গরম কাবাব সাথে রুটি, খুবই মজা করে খেলাম।

শেষ দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা দুঃসংবাদ শুনতে পেলাম। আগের দিন সন্ধ্যায় নাকি দুইটা ছেলে ক্রিকেট খেলছিল। বলকে বোমা মনে করে এক সেনা তাদের একজনকে গুলি করে মেরে ফেলেছে, এইজন্য শহরের পরিস্থতি থমথমে। এতদিন প্রতিদিনই অবশ্য কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অসংখ্য ট্রাক দেখতে পেয়েছি। মাঝে মাঝে আমাদের গাড়ি থামিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে তারা দেখেছেনও – একবার তো পাসপোর্টও দেখাতে হয়েছিল। শুনলাম যে শুধু শ্রীনগর শহরেই নাকি লাখ সাতেক সৈন্য আছে। গ্রামের দিকের অবস্থা নাকি বেশ খারাপ, ওখানে নাকি মাঝে মাঝেই লোকজনদের মেরে ফেলে, মেয়েরাও নির্যাতিত হয়। এগুলোর সত্যতা অবশ্য যাচাই করতে পারিনি, সবই স্থানীয়দের মুখে শুনা। কোনও নতুন শহরে গেলেই আমি রাতে সিনেমা হলে সিনেমা দেখি – শ্রীনগরে সে সুযোগ পাইনি। ছয়টা সিনেমা হলের সবগুলোই বন্ধ – সিনেমা হল বোমার জন্য খুব ভাল টার্গেট, এইজন্য সবগুলো বন্ধ করে রেখেছে। একটা রাজধানী শহরে সিনেমা হল নেই, ভাবা যায়? কাশ্মীরের লোকজন ভারতীয় পাসপোর্টধারী হলেও তারা নিজেদেরকে ভারতীয় বলে মনে করে না – দে সিম্পলি ডোন্ট বেলোং টু ইন্ডিয়া। অন্যান্য রাজ্যের লোকজনও নাকি ওনাদেরকে অন্য চোখে দেখে – ভারতীয় হিসেবে না, কাশ্মীরি হিসেবে।  ভারত – বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা হলে ওরা বাংলাদেশকে সমর্থন করে। বাংলাদেশ – পাকিস্তান খেলা হলে অবশ্য এটা আবার উল্টে যায়।  যে কারনেই হোকনা কেন, পাকিস্তান স্বাধীন কাশ্মীরকে সমর্থন করে এইজন্য পাকিস্তানের প্রতি ওদের আলাদা একটা টান আছে।

শ্রীনগরে কয়েকটি খুব সুন্দর মুঘল গার্ডেন আছে – শালিমারবাগ, নিশাতবাগ, আর চশমাশাহী। আমরা গিয়েছিলাম শালিমারবাগে। সম্রাট জাহাঙ্গীর তার বউ নুরজাহানের জন্য এই বাগানটি বানিয়েছিলেন সেই ১৬১৯ সালে। ডাল লেকের ধার ঘেঁষে বানানো এই বাগানটাতে তিনটা টেরাস আছে – পুরোটাই পার্সিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি। টেরাসের একটা দিওয়ান-ই-আম মানে জনসাধারনের, একটা দিওয়ান-ই-খাস মানে অন্দরমহলের জন্য আরেকটা ছিল হারেমখানার জন্য। এখন অবশ্য আর এগুলো আলাদা করা যায়না।  তিনটা টেরাস আবার তিন রকমের উচ্চতায়, পানির সোর্স আছে সেখানে, ঝর্ণার পানি বয়ে যাচ্ছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। ফাঁক দিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে দুইশ বছরের পুরানো চিনার গাছ। চারদিকে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। কেমন এক শান্তি শান্তি ভাব আছে চারদিকে। নানা বয়সের লোকজন এসেছে, বাচ্চারা যেমন আছে তেমনি আছেন বৃদ্ধরা। বসার জন্য বেঞ্চও পাতা আছে – কেউ চাইলে ওখানে বসেই সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারেন। শ্রীনগরের শালিমারবাগ থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়ে পরে দিল্লী আর লাহোরে এই নামেই বাগান করা হয়। একসময় সম্রাট জাহাঙ্গীর – নুরজাহানকে নিয়ে যেই পথ ধরে হাঁটতেন সেই পথ দিয়েই হাঁটছি ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল।

শালিমারবাগ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই মন খারাপের এক দমকা হাওয়া ধাক্কা দিল – আমাদের ট্যুরের সময় যে শেষ হয়ে এল। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে যেতে হবে আবার বাস্তবতার মাঝে। বাক্স-পেঁটরা গুছিয়ে শ্রীনগর এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিলাম। শ্রীনগর এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে না বললেই নয়। এত চেকিং আমি আমার জীবনে আগে কখনো কোথাও দেখিনি। প্রথমেই  এয়ারপোর্ট থেকে বেশ কিছুটা দূরে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল আমাদের। সব ব্যাগ নামিয়ে একটা স্ক্যানারে দিতে হল। আমরাও স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে গেলাম, ম্যানুয়াল চেকিং ও করা হল। এরপর ব্যাগগুলো নিয়ে আবার গাড়িতে উঠলাম। এয়ারপোর্টে এসে আবার সবকিছু স্ক্যানারে। দেখি যে, হ্যান্ড লাগেজসহ সবকিছুই চেকইন লাগেজ হিসেবে দিয়ে দিচ্ছে। তার আগে শক্ত দড়ি দিয়ে পুরো ব্যাগটা বেঁধে ফেলল। অবস্থা বেগতিক দেখে কোনওমতে ল্যাপটপ আর ক্যামেরা বের করে ফেললাম। লাগেজ ড্রপ করার পর আবার একজনকে ভেতরে ঢুকে সবগুলো লাগেজ আইডেনটিফাই করতে হল। এরপর আবার আমাদেরকে আবার একটা স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে বাকি জিনিশপত্র নিয়ে যেতে হল। যে সাথে কেবিনে নেওয়ার জন্য ব্যাগ নিয়েছে তার অবস্থা খারাপ – একটা একটা করে প্রত্যেকটা বের করে দেখাতে হয়েছে, সে দুধের কৌটাই হোক আর লবণের শিশি। ল্যাপটপের ঢাকনা খুলে অন করে দেখাতে হল। এরপর ক্যামেরার লেন্স খুলে, ক্যামেরাও অন করলাম। একদম শেষ ধাপে আরেকজন চেক করার সময় বলে যে ল্যাপটপের জন্যও একটা সিকিউরিটি সিল লাগবে। আবার পেছনে যেয়ে এটা ট্যাগে সিল মেরে আসলাম। মনে ভয় থাকলে আর সিস্টেম এফিসিয়েন্ট না হলে যে কি রকমের বিশৃঙ্খলা হয় এটা তার একটা উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।

শ্রীনগর ছাড়ার সময় উদাস চোখে হিমালয় পর্বতের দিকে তাকিয়ে থাকলাম আর গত কয়েকদিনের কথা মনে করতে লাগলাম। ইউরোপের অনেক সুন্দর জায়গায় আমি গিয়েছি যা অনেকটা কাশ্মীরের মতই। কিন্তু ওসব জায়গার সৌন্দর্যের সাথে প্যাকেজ হিসেবে আসে তীব্র শীত – আফ্রিকাতে আবার উল্টোটা। বেশিক্ষণ সেই শীতে সবকিছু উপভোগ করা যায়না। এবারের কাশ্মীর সেই অর্থে আমার কাছে ব্যতিক্রম ছিল। চমৎকার আবহাওয়া – গরমও লাগেনি আবার ঠাণ্ডাও না। সাথে মজাদার খাবার আর সস্তা জিনিসপত্র আশীর্বাদের মত ধরা দিয়েছে। আর কয়েকমাস পর গেলে কাশ্মীরের অন্য রূপ দেখা যায়। এখন যে’সব জায়গা ধবধবে সাদা হয়ে আছে সেসব জায়গা ভরে যাবে সবুজে। আর আপেল বাগানে ঝুলে থাকবে থরে থরে আপেল। চোখ বন্ধ করে সেগুলোই কল্পনা করলাম – বাস্তবের সাথে মিলিয়ে নিতে আবার আসতে হবে যে ভূস্বর্গে – ভয়ঙ্কর সুন্দর ভূস্বর্গে!

 

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT