কলম্বো থেকে এল্লা

What is your dream destination?

কলম্বো থেকে এল্লা

সাধারণত সারা বছর অফিস থেকে কোনও ছুটি নেওয়া হয়না – শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা – শুধু কাজ করে যাওয়া। এটা অবশ্য আমি উপভোগই করি। বছর শেষে ভাবলাম যে একটা দুই সপ্তাহের ছুটি নিব। চোখটাও খুব সমস্যা করছিল – ডি-জেনারেশন শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই ভাবলাম ঘুরতে যাওয়ার সময় চোখটাও দেখিয়ে আসি, চেন্নাইতে নাকি খুব ভাল চোখের হাসপাতাল আছে। ম্যাপ নিয়ে বসলাম যে চেন্নাই থেকে চোখ দেখিয়ে আর কোথায় যাওয়া যায়। তাজমহল দেখার শখ আমার অনেকদিন ধরেই। ভাবছিলাম যে চেন্নাই থেকে সরাসরি দিল্লীতে চলে যাব নাকি – সেখান থেকে – কাশ্মীর। এদিকে আবার অনেকদিন ধরেই ভুটান যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ওদের ঢাকা থেকে ফ্লাইটের সময়টা এমন বিশ্রী যে আমার শনি-রবি  উইকেন্ডের সাথে মেলে না।

যাইহোক, অফিস থেকে বাসাতে এসে প্রায় প্রতিদিনই গুগল ম্যাপ খুলে বসে থাকতাম – চেন্নাইতে যাত্রা শুরু করে, আশেপাশে কোথায় একটু ঢুঁ মারা যায় সহজে এটা খুঁজে বের করার অভিপ্রায়ে। ম্যাপে খুব সহজেই মনে মনে এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যাওয়া শুরু করলাম এক সময়ে – বাস্তবে যেতে না পারলেও, কল্পনা কিন্তু থেমে থাকল না। এরকম করতে করতে একদিন চোখ আটকে গেলো – শ্রীলঙ্কাতে। সে চোখ আর কিছুতেই সরে না। কেমন একলা একটা দেশ, চোখের পানির মত ভেসে আছে পৃথিবীর বুকে। তখনি মনে হল, ওখানে একটু পা ফেলতেই হবে। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত এমন পরিকল্পনা করে ফেললাম যে, কোনও শখই আর অপূর্ণ থাকলো না। শ্রীলঙ্কা থেকে মালদ্বীপ, আর দিল্লী-আগ্রা থেকে ভুটান কিছুই বাদ পড়ল না – দুই সপ্তাহের বেশি শুধু ছুটেই গেলাম এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে।

 

চেন্নাইতে ভয়াবহ বন্যার কারণে, চোখের ডাক্তার চেন্নাই থেকে পরিবর্তন করে ব্যঙ্গালোরে ঠিক করলাম। সন্ধ্যের দিকে কলম্বো যাওয়ার ফ্লাইট ব্যাঙ্গালোর থেকে। ঝকঝকে এয়ারবাস আর উড়োজাহাজের কেবিন ক্রুদের অতিথেয়তার মাঝখানে রাত ১০:০০ টার দিকে কলম্বো পৌঁছে গেলাম। কলম্বো বিমানবন্দরে নেমেই, আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল, এর জন্য অবশ্য আমার সংকীর্ণ মনই দায়ী। শ্রীলঙ্কা আমাদের থেকে জনসংখ্যা আর আয়তনে ছোট দেশ, আমাদের প্রতিবেশীও। তাই ভেবেছিলাম যে ওদের বিমানবন্দর আমাদের মতই হবে। কিন্তু আমার সে ধারণা ভেঙ্গে দিল বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর – বিশালাকায়, আধুনিক, পরিষ্কার – পরিচ্ছন্ন, আলো-ঝলমলে বিমানবন্দর – মন খারাপের হেতু এর সাথে ঢাকার তুলনা করতে যেয়ে।

গেট থেকেই একটা মোবাইলের সিম কিনে নিলাম। আর সাথে কিছু টাকাও ভাঙ্গিয়ে ফেললাম। শ্রীলঙ্কার মত এত ভাল ইন্টারনেটের গতি উপমহাদেশের আর কোথাও পাইনি।  বাংলাদেশের টাকার তুলনায় শ্রীলঙ্কান রুপির মূল্যমান কম, তাই বেশ অনেকগুলো রুপি ই পেলাম ডলার ভাঙ্গিয়ে। কোনও চেক-ইন লাগেজ সাথে ছিল না, তাই  রাত ১০:৪৫ এর দিকেই বিমানবন্দরের বাইরে চলে এলাম। বের হয়েই, সস্তায় শহরে পৌঁছানোর উপায় খুঁজতে থাকলাম। এমন সময় চোখে পড়ল ছোট্ট একটা বাস – অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে, মুড়ির টিন বললেও ভুল হবে না। কলম্বো যাবে কিনা জিজ্ঞেস করে উঠে বসে পড়লাম জানালার পাশে। বাস ছাড়তেই দেখতে পেলাম – হাসিখুশি, আমুদে, প্রাণখোলা লঙ্কানদের। ড্রাইভার গান চালিয়ে দিল – কান ফাটানো কিন্তু সুরেলা – সাথে সাথেই দেখি বাসের লোকগুলো গানের তালে তালে শিশ বাজাতে শুরু করে দিল। টিভির পর্দায় ক্রিকেট খেলা দেখার সময়, লঙ্কানদের মাঠে বসে ক্লান্তিহীন ভাবে বাজনা বাজাতে দেখেছি – চোখের সামনে প্রায় একই জিনিস দেখে মনটা ভীষণ ভাল হয়ে গেল – এজন্যই তো শ্রীলঙ্কাকে অনেকেই সেরেন্দিপ বলে ডাকে – ইংরেজি সেরেনডিপিডি থেকে যেই শব্দটা এসেছে – যার মানে হঠাৎ ভাগ্যগুণে কোনও দারুণ কিছুর দেখা পেয়ে যাওয়া।

ক্লান্তিতে একটু ঢুলুনি মত এসেছিল – এমন সময় বুঝতে পারলাম যে বাস আর যাবে না, কলম্বো শহরে এসে পড়েছি। নিচে নেমে দেখলাম যে একটা বাজারের আশে পাশে বাস থেমেছে। গুগল ম্যাপে আগে থেকে ঠিক করা হোটেলেরে ঠিকানা টা রাউট করে নিলাম। প্রায় দুই কিলোমিটারের মত হাঁটতে হবে। এমন সময় শুরু হল টিপটিপ বৃষ্টি। দ্রুত পা চালিয়ে গুগলের দেখানো পথে সামনে এগুতে লাগলাম। অন্ধকার রাস্তায় অচেনা শহরে নিশুতি রাতে হাঁটতে একটু ভয়ও করছিল। সেই ভয়টা আরও বাড়িয়ে দিয়ে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা মোবাইলের চার্জটাও শেষ হয়ে গেল। বৃষ্টি মাথায় ফুটপাথের ওপর বসে, ব্যাগ খুলে পাওয়ার ব্যাঙ্ক দিয়ে মিনিট পাঁচেক চার্জ দেওয়ার পর আবার মোবাইল কাজ করা শুরু করল। এরপর বিভিন্ন অলি-গলির মধ্য দিয়ে রাত ১২:৩০ এর দিকে হোটেলে পৌঁছালাম। হোটেল না বলে হোস্টেল বলাই ভাল, এক রুমে একাধিক মানুষ থাকতে হবে। এত রাতে, হোস্টেলের ফ্রন্ট ডেস্ক খোলা পাব কিনা এই নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু হোস্টেলে ঢুকেই দেখলাম যে ওরা আমি আসব এটা আশা করছিল – একজন তো এই রাতেও শরবত নিয়ে হাজির – ঢকঢক করে গলায় ঢেলে, আরও এক গ্লাস চাওয়ার লোভ অনেক কষ্টে সংবরণ করলাম। রুমে ঢুকেই অন্য আর-একজনের উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম তাই আলো না জ্বালিয়ে মোবাইলের আলোতে জামা-কাপড় পরিবর্তন করে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন সকাল সকাল কমন বাথরুমে গোসল করে সকালের নাস্তাটা হোটেল থেকেই সেরে নিলাম। বুঝতে পারলাম যে আমার মত আরও অসংখ্য বিদেশি ব্যাকপ্যাকার আছে এখানে। শীতকাল ভেবে গরম কাপড় নিয়ে এসেছিলাম, এখন হাফ হাতা গেঞ্জি আর শর্টস পরে ঘুরে বেড়ানো সাদা চামড়ার ভদ্রলোকদের দেখে হিংসে হতে লাগলো। এক্কেবারে আলো ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল মিষ্টি সকাল! লঙ্কার প্রাচুর্যের লোভে পর্তুগীজে থেকে ওলন্দাজ হয়ে ইংরেজ, সবাই এখানে খুঁটি গেড়েছিল – তার কিছু নমুনা দেখতে পেলাম স্থাপত্যশৈলীতে। আমি নিশ্চিত যে অনেক ভবনের ছবি আপলোড করে প্রশ্ন করলে কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করবে না যে এটা শ্রীলঙ্কা – ভাববে ইউরোপের কোনও জায়গা। সেদিন রবিবার ছিল – রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। উদ্দেশ্যহীন ভাবে কলম্বোতে হাঁটাহাঁটি করেই অনেকটা সময় চলে গেল।  আমার ট্রেন ছাড়ার যখন আর খুব বেশী দেরি নেই তখন একটু খুঁজে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

একদিন খুলনা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে গাড়ির ভেতর বসে বসে ঝিমাচ্ছিলাম আর ঝিমানোর ফাঁকে ফাঁকে জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলাম। এমন সময় মনে হল যে এমন কিছু জায়গায় গেলে কেমন হয় যেখানে যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে মনে হবে যে গন্তব্যে না পৌঁছালেও হবে। ইংরেজিতে যাকে বলে – সামটাইমস, জার্নি ইজ মোর বিউটিফুল দ্যান দি ডেসটিনেশন। যেই ভাবা সেই কাজ, বসে গেলাম খুঁজতে। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম শ্রীলঙ্কার একটা ট্রেন যাত্রার অনেকেই খুব প্রশংসা করছে – কলম্বো থেকে এল্লা। শ্রীলঙ্কা যাত্রার পরিকল্পনা করার সময়ই মনস্থির করে ফেলেছিলাম যে এই ট্রেনে উঠবোই। যেহেতু এই রুটটা অনেক জনপ্রিয়, তাই টিকেট অনেক আগে থেকেই কাটতে হয়। অনলাইনে খোঁজ-খবর নিয়ে বুঝলাম যে দুইটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এক্সপো রেইল আর রাজধানি এক্সপ্রেস এই রুটে আছে আর ওদের টিকেট  অনলাইনে পাওয়া যায়। টিকেট কাটার সময় একটা ব্যাপারে আমি বেশ দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। দুইটা প্রতিষ্ঠানের ট্রেনই দেখি কলম্বো থেকে সকাল ৯:৪৫ এ ছাড়বে। আমি এক্সপো রেইলের টিকেট অনলাইনে কেটেছিলাম – স্টেশনে আলাদা একটা কাউন্টার আছে, ইমেইল কনফার্মেশন দেখাতে আমাকে টিকেট প্রিন্ট করে দিল।

কলম্বোর বিমানবন্দরটা যথেষ্ট নতুন আর আধুনিক হলেও, ট্রেন ষ্টেশনটা কিন্তু বেশ পুরাতন। পুরনো হলেও ছিমছাম, পরিষ্কার – একটুও ময়লা নেই কোথাও। খুব যত্নের সাথে রংবেরঙের ফুল লাগিয়ে রাখা। বড় আর সুন্দর কিছু বইয়ের দোকান মনে করিয়ে দিল যে এই দেশের ৯১ শতাংশ মানুষই শিক্ষিত।  ট্রেনে উঠতে গিয়ে আমার একটু আগেই বলা বিভ্রান্তির অবসান ঘটল। আসলে একটা ট্রেনই কলম্বো থেকে এল্লার দিকে যাবে, কিন্তু ট্রেনের দুইটা বগি – দুইটা কোম্পানি ভাড়া নিয়েছে, এক্সপোরেইল আর রাজধানী এক্সপ্রেস – ওদের মত করে বগি দুটো রঙ করে ব্রান্ডিং করে নিয়েছে। অন্যান্য বগি গুলো জরাজীর্ণ হলেও, এক্সপোরেইলের বগিটা ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। যদিও, এসি দেখে হাসি আটকে রাখতে পারলাম না, বাসায় ব্যবহার করা দুই টনি এসি ট্রেনের বগিতে লাগিয়ে দিয়েছে। টিভি দেখে আরও হাসি পেল। একটা ডেক্সটপ কম্পিউটারকে টিভির মত করে ফেলেছে আর সিনেমা চালিয়ে দিয়েছে – সিপিইউটা দেখি একটা খাঁচার মধ্যে আটকে রাখা, আর মাঝে মধ্যেই মনিটর এ চোরাই উইন্ডোজের চোখরাঙ্গানি!

সময়মতই ট্রেনটা ছাড়ল – লোকাল ট্রেন বললেও কম বলা হবে, দু মিনিট পরপরই ট্রেন থামতে লাগলো। পরে দেখেছিলাম যে ৮৯ টা স্টেশনে এই ট্রেন থামে, ২০০ কিলোমিটার যেতেই তাই ৯ ঘণ্টা লেগে যায়। প্রথম ঘণ্টাখানেক বাংলাদেশের গ্রামের মতই লাগলো, নারিকেল আর কলা গাছ লাগানো রাস্তার দুইপাশে – নাম না জানা অনেক গাছ তো আছেই। আকাশটা অবশ্য আরও পরিষ্কার আর সুনীল। কয়েক ঘণ্টা পর চারদিকের চেহারা পরিবর্তন হওয়া শুরু করল। কখনো পাহাড়, কখনো মেঠো পথ, আবার কখনো বয়ে চলা নদী বা নিস্তরঙ্গ লেক, সবকিছু মিলে মিশে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। এরপর এসে হাজির হল সবুজ চা বাগানগুলো। ঢেউ খেলানো সবুজ কার্পেট বিছানো একটু পর পরই। আমাদের ট্রেনটা বেশ উঁচু দিয়ে চলছিল। তাই সরু ফিতার মত রাস্তাগুলোও মোহময় হয়ে উঠছিল চা বাগানের ফাঁক দিয়ে। এসব কিছু দেখতে দেখতে আমি আর আমার সিটে চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না – একবার ডানে তাকাই তো পর মুহূর্তেই বামে উঁকি দেই। দেখলাম যে এটা শুধু আমারই হচ্ছে না – ট্রেনের সব যাত্রীরই চোখে মুখে একইরকম আনন্দমিস্রিত বিস্ময়ের আভা – সব বয়সের, সব জাতির! আকাশে মেঘগুলো পেজো তুলোর মত ভেসে বেড়াচ্ছে ইতি উতি – হাত বাড়ালেই বুঝি ধরা যাবে। এদিকে কিছু খেয়ালি মেঘও আছে, যারা দুধের সরের মত জমাট বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি হয়ে নামার অপেক্ষায়।

এল্লা তে এসে যখন ট্রেনটা থামল, তখন রাত হয়ে গিয়েছে, প্লাটফর্ম থেকে বের হয়েই প্রথম ধাক্কা খেলাম – ও মা! এ যে পুরদস্তুর গ্রাম! চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর লোকজন নাই বললেই চলে। আগেথেকেই একটা বাসা ভাড়া করা ছিল, গুগল বাবাজির দেখানো পথ ধরে আগাতে লাগলাম, পিঠে আমার ২ সপ্তাহের সঙ্গীদেরকে ধারণ করা ব্যাগ। প্রধান রাস্তা থেকে, একটা শাখা রাস্তায় যেয়ে পড়লাম। এরপর শুধু ওপরে উঠছি তো উঠছি, আর একটু পর পরই বাঁক নিচ্ছি। একসময়, আবছায়াটাও আর থাকলো না, ঘুটঘুটে অন্ধকার, সাথে ডিসেম্বরের শীত আর কিছু কুকুর।

ঠিক, এমন সময়ই শুরু হয়ে গেল শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত বৃষ্টি, সে যে কখন আসে আর কখন যায় তার কোনই ঠিক ঠিকানা নেই! যতই সামনে আগাতে লাগলাম ততই, শীত উধাও হয়ে তার জায়গা নিল ঘাম আর বৃষ্টির পানি। সাথে আমার মধ্যবিত্ত বাংগালি ফুসফুসের আহাজারি। আর আমার মনে বদ্ধমূল ধারনা জন্মাতে লাগল যে আমি পথ হারিয়েছি। আমি ঠিক জায়গায় আসিনি। মুরাকামির গল্পের মত এমন এক জায়গায় ট্রেন থেকে নেমেছি যেখান থেকে আর কোনদিন কোনও ট্রেন অন্য কোথাও যাবে না। এমন এক জায়গায় আমি এসে পড়েছি যেখানে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। ও ভুল বললাম! আমি ছাড়া আছে আরো কিছু কুকুর – যারা ছায়াসঙ্গির মত আমার সাথে আছে আমার দুর্ভোগ দেখবে বলে – আর নিশ্চিত করছে যেন আমি আর পেছনে না ফিরতে পারি । সামনে কি আছে সেটা দেখা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই!

অন্ধকারে এভাবে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা বাড়ির দেখা পেলাম – আলো জ্বলছে। সেখানেই ঢুকে যাকে পেলাম তাকে আমি যে বাসায় থাকবো তার ঠিকানা দিলাম। ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে মনে হয় চেনে, ফোন করে দিল আমার হোস্টকে। মিনিক পাঁচেকের ভেতর একটা মোটরসাইকেল নিয়ে অনিল এসে হাজির। বাসায় পৌঁছে, ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়ে গোসল সেরে ফেললাম। বাইরে তখন ঝি ঝি পোকার ডাক আর কিসের যেন গর্জন শোনা যাচ্ছে। পরদিন ভোরের আলোতে বুঝেছিলাম যে ওই গর্জন পাশের একটা ঝর্ণার।

যে বাসায় উঠেছিলাম তার কথা একটু বলে নেই। ছেলেটার নাম অনিল, তার বউ হল ধেনু, সাথে একটা ছোট মেয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী মিলেই ৪/৫ রুমের বাসায় অতিথিদের রাখছে। হোটেল না হলেও, হোটেলের সব সুযোগ সুবিধাই আছে – সুন্দর আসবাবপত্র, উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেট, সকাল আর রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা, লাগোয়া বাথরুম। এরা খুব বেশী অবস্থাপন্ন না, মানুষজনের আসার ওপর নির্ভর করে এদের জীবিকা, মানুষ যদি আসে তাহলে ভাল, কিন্তু না আসলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। অনিল আর ধেনুর আতিথেয়তায় আমি রীতিমত মুগ্ধ – খুব ভাল মানুষ ওরা – সহজ সরল। প্রথম দিন থেকেই ওদেরকে কিভাবে সাহায্য করা যায় এটাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল – শেষ পর্যন্ত ওদের জন্য একটা ওয়েবসাইট বানিয়ে দিয়ে এসেছিলাম যেন মানুষজন সহজেই অনিলের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। সেদিন ওর একটা মেইল দেখলাম – কৃতজ্ঞতার মেইল – ওয়েবসাইটটা লাইভ হওয়ার পর থেকে নাকি এখন আগের থেকে বেশী অতিথি পাচ্ছে! আমার এক বিকেলের পরিশ্রম সার্থক।

যাইহোক, সেদিন রাতে অনিলের সাথে টুকটাক কিছু কথা বললাম – আমার খুব ইচ্ছা ছিল হর্টন প্লেইন ন্যাশনাল পার্কে যাওয়ার। কিন্তু ওখানে পাবলিক পরিবহনে যাওয়া সম্ভব না, আবার একা একটা গাড়ি ভাড়া করে যাব এটাও টাকার কথা ভেবে সাহস হচ্ছিল না। তাই ওখানে আর যাওয়া হবে না এইটা ভেবে দরজা বন্ধ করে ঘুমাতে গেলাম। বিছানায় শুয়ে আছি, ঘুম আসব আসব করছে এমন সময় শুনি দরজায় ধাক্কার শব্দ। দরজা খুলে দেখি অনিল আর সাথে একটা লম্বা বিদেশি মেয়ে। অনিল বলল যে মেয়েটা একা একা ভোরে একটা গাড়ি ভাড়া করে হর্টন ন্যাশনাল পার্কে যাবে, আমি যেহেতু যেতে চেয়েছি তাই আমাকে বলতে আসল। খরচটা জিজ্ঞেস করে রাজি হয়ে গেলাম। একটাই সমস্যা, ভোর ৪ টায় রওনা দিতে হবে, শীতের রাতে, আর এখন বাজে ১২:৩০। ৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারব না!

ভোর রাতে দরজায় আবার আঘাত, একবার ভাবলাম যে মটকা মেরে পড়ে থাকি – বাঙ্গালির ছেলে আমি – এত দৌড়ঝাঁপ কি আমার শরীরে সয়! বরং লেপের নিচে নাম ডেকে আরাম করে ঘুমিয়ে থাকি – তাতেই জীবনের পরম শান্তি। কিন্তু আগের রাতে কথা দিয়ে দিয়েছি যে – রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করল। শরীরটাকে কোনও মতে টেনে নিয়ে গাড়ির ভেতর ফেললাম। গাড়ি চলা শুরু করতেই দেখলাম মেয়েটা রীতিমত নাক ডেকে ঘুমাতে শুরু করে দিয়েছে। আমি ভোর হওয়ার দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

মেয়েটার নাম লরেন – লরেন হাবেরফিল্ড। অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত, এখন থাকে ফ্রান্সে। লরেনের সাথেই বাকি দিনটা কাটল। চমৎকার একটা মানুষ, আমরা হর্টন প্লেইনে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির গল্প করলাম। হাঁটতে হাঁটতে যখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিলাম বসে বসে তখনও আমাদের গল্প থামল না – ঘোরাঘুরির গল্প মোড় নিল মানুষ, ধর্ম, সংস্কৃতির দিকে। গাড়ির টাকার একটা অংশ দেওয়ার পর আমাকে অনেকবার ধন্যবাদ দিল – বলল যে হাতের টাকা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল – কিভাবে কি করবে বুঝতে পারছিল না – এই টাকাতে অনেক উপকার হবে। দুপুরের পর, লরেন চলে যাবে এডামস পিকে আর আমাকে ফিরতে হবে এল্লাতে। বিদায়মুহুর্তে হাত মিলানোর পর যখন একটু জড়িয়ে ধরলাম তখন মনে হল যে এই পৃথিবীতে কত অদ্ভুত সম্পর্কই না আছে। আমরা বন্ধু না, আমাদের দেখা হয়েছে কয়েক ঘণ্টার জন্য আর জীবনে হয়তো কোনোদিনও দেখা হবে না, দেখা হলেও হয়তো আমরা একে অপরকে চিনতে পারবো না, কিন্তু, দিনটার স্মৃতি আমার কাছে থেকেই যাবে, সারাজীবনের জন্য!

হর্টন প্লেইনের ভেতর ঢুকলে মনে হবে না যে এশিয়াতে আছি। আমার তো মনে হয়েছে পৃথিবীতেই নেই, যদিও পরে ছবি দেখে বুঝেছি যে স্কটল্যান্ডের সাথে হয়তো এর কিছুটা মিল আছে। এই জায়গাটা আসলে একটা মালভূমি যেখানে পাহাড় আছে, আর আছে সবুজ ঘাস এবং ক্লাউড ফরেস্ট। রাস্তায় দেখা মিলবে সাম্বার হরিণ, লেঙ্গুড় আর মঙ্গুজের। এক জায়গায় দেখতে পেলাম একটা গিরগিটি। গিরগিটিটাকে যেন তার শত্রুরা খুঁজে না পায় তাই সে আশপাশের মত করে সবুজ রঙে রাঙ্গা। বোকা গিরগিটিটা বুঝতে পারেনি যে সে যেখানে আছে সেখানে আর সবুজ নেই, সব ধূসর হয়ে গিয়েছে আর ওকেই সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। এর মাঝে পাথর ডিঙ্গিয়ে, ছোট ছোট নালা পেরিয়ে, ঘাসের জঙ্গল আর উঁচু নিচু পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ১২০০ মিটার উঁচু এক খাদের ধারে, যেটাকে বলে ওয়ার্ল্ডস এন্ড – পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। ওখানে যেয়ে আসলেই মনে হয়েছিল যে এর পর আর কিছু নেই। সেকি গহীন খাদ, আর যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজে আবৃত পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে গল পর্যন্ত দেখা যায়। কিছুক্ষণ সেই খাদের ধারে এক কাঠের বেঞ্চে পা ঝুলিয়ে বসে থাকলাম আর চারদিকের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। সত্যি কথা বলতে, এখানেই দিনটা পার করে দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু আমার বড়ই তাড়াহুড়া, তাই সামনে এগোনো লাগলো।

পথে পড়ল বেকার’স ফল – বেকার সাহেবের জলপ্রপাত। সেকি গর্জন – কান ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা। সাথে পানি এসে মুখ ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ছাঁটের মত।  এমন গর্জনশিলা ঝর্ণা এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য জীবনে খুব বেশী হয়নি।

হর্টন প্লেইন থেকে দুপুরের দিকে বের হয়ে আসলাম। আবার এল্লাতে ফিরে যেতে হবে। একটু খোঁজ নিয়ে বুঝলাম যে নিকটস্থ ট্রেন স্টেশন হল নানু ওয়া। নানু ওয়া’র পথে যেতে এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। সেই বিস্ময় হল একটা ছোট্ট গ্রাম যার নাম আম্বেওয়েলা – ছবির মত সাজানো গুছানো এক গ্রাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, যে এই গ্রামকে ছোট নিউজিল্যান্ড বলা হয়। এখানে বাতাস খুব তীব্র, তাই অনেকগুলো উইন্ডমিল বসানো আছে। আবহাওয়াগত কারনে ডেইরি ফার্মিং এখানে খুব ভাল হয়। অনেক বড় বড় ফ্রিজিয়ান গাভী দেখতে পেলাম। অল্প কিছু টাকা দিলে গরুর টাটকা দুধ খাওয়ারও ব্যবস্থা আছে।

নানু ওয়াতে যখন পৌঁছালাম তখন ট্রেন আসি আসি করছে। সেই ব্রিটিশ আমলের মত দেখতে ট্রেনের টিকেট কেটে উঠলাম – একেবারে লোকাল ট্রেনের বগিতে। আবারও পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, চা বাগানের মাঝখান দিয়ে যাত্রা শুরু হল। এবারের কামরা টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না, তাই, জানালা খুলে মাথা বাইরে বের করে বুভুক্ষুর মত চারদিকে দেখতে লাগলাম। এর ফাঁকে ফাঁকে কখনো বা উঠে গেলাম খোলা দরজার ধারে, যেখানে ঝুলন্ত অবস্থার শিহরন উপভোগ করলাম। ট্রেন লাইনটা এতটাই আঁকা-বাঁকা যে, জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সাপের মত বেঁকে চলা ট্রেনটার পুরোটারই ছবি তোলা যায়! এমনও হয়েছে যে ট্রেনটা বাঁকতে বাঁকতে প্রায় নব্বই ডিগ্রি কোণে বেঁকে গিয়েছে – সেই সময়ের তোলা ছবি দেখালে যে কেউই বলবে যে ট্রেনের বাইরে থেকে তোলা ছবি। এল্লাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দিনের আলো পড়ে এল – ততক্ষণে খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে। রাস্তার পাশে এক হোটেলে ঢুকে একেবারে দুপুর আর রাতের খাবার খেয়ে ফেললাম। বিদেশ বিভূঁইয়ে, ভাত, ডাল আর ডিমই ভরসা!

পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাইকিংয়ে বেরিয়ে পড়লাম – গন্তব্য লিটল এডামস পিক। এটা মোটামুটি ২ থেকে ৩ ঘণ্টার হাইক – বেশী কঠিন কিছু না। রাস্তার পাশে পথনির্দেশিকা দেওয়া আছে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে হয়। একেবারে গা ঘেঁষে, চা বাগানের শ্রমিকরা চায়ের পাতা তুলছিল। আমার কাছাকাছি বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন বয়সের মানুষ দেখতে পেলাম। লিটল এডামস পিকের ওপরে যখন উঠলাম তখন তিনশ ষাট ডিগ্রি ভিউ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। নিজে তো ১১০০ মিটার ওপরে আছি, সেজন্য অনেক নিচের সব জিনিস দেখা যাচ্ছে। ঐযে চিকন ফিতার মত দেখতে কি যেন, ওপর দিয়ে ম্যাচের বাক্স যাচ্ছে পিঁপড়ের সারির মত – বুঝলাম যে সেই রাস্তাটা। আমার বাসার পাশে যেই ঝর্ণার শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে, সেই ঝর্ণাই সুদূরে দেখা যাচ্ছে। এক দিকে খুবই অভিজাত একটা হোটেল – যেটার দাম সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, তাই দূর থেকে দেখেই মন ভরালাম। প্রতি মুহূর্তেই চারদিকের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। রৌদ্র আর মেঘের লুকোচুরিতে সবুজ পাহাড় আর বাক্সের মত ধানক্ষেত এক এক সময় এক এক রঙে সাজাচ্ছে নিজেদেরকে। আর এগুলোর মাঝখানে আছে একটা কুকুর – সে নাকি প্রতিদিন সকাল হওয়ার সাথে সাথে এখানে উঠে আসে, যতক্ষণ, একজন মানুষও এখানে থাকে ততক্ষণ সেও থাকে। সূর্যাস্তের পর যখন শেষ মানুষটা নামে, তখন তার সাথে সেও নেমে যায়।

ট্রেনে তো চড়া হল — লাল রঙয়ের লোকাল বাসটাও হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। সুযোগ বুঝে উঠে পড়লাম। গেরুয়া রঙের পোশাক পরা বৌদ্ধ সাধুদের বাসের ভেতর দেখা গেলা মনে হল যে ওনাদের বসার জন্য একটা আলাদা জায়গা আছে যেমন মহিলা ও শিশুদের বসার জায়গা রিজার্ভড অবস্থায় থাকে। বাস একটা জায়গায় আসতে, বেশ হই হই করে কয়েকজন নেমে গেল। আমিও তাদের পিছু নিলাম। একটু পর বুঝতে পারলাম যে বিশাল এক জলপ্রপাতের সামনে চলে এসেছি – রাবণ এলা প্রপাত। এখানে অবশ্য অনেক ভিড় – রাস্তার পাশে মানুষ দোকানের পসরা সাজিয়েছে, একটু সামনে দাঁড়ালেই বিক্রি করতে চলে আসে। জলপ্রপাতটি কিছুটা বেড়া দিয়ে ঘেরা হলেও, অনেকেই জলপ্রপাতটির অনেক কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, একটা ভাল ছবি তোলার আশায়। রাস্তা জুড়ে যতটা না মানুষ আছে, বানর তার থেকে কম নেই – শুধু ইতি উতি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, রাস্তা দিয়ে যে হরহামেশা বাস-ট্রাক যাচ্ছে এতে তাদের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।

পরবর্তী অভিযান, দেমোদরায় নাইন আর্চ ব্রিজ খুঁজে বের করা। কোনও ধরনের ইস্পাত ছাড়াই শুধুমাত্র পাথর, ইট আর সিমেন্ট দিয়ে ১৯২১ সালে এই সেতুটি ট্রেন চলার জন্য তৈরি করা হয়। কথিত আছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য সব ইস্পাত এখান থেকে নিয়ে অন্য কোনও জরুরী কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় – কিন্তু এই সেতুর কাজ থেমে থাকে নি। প্রায় একশ ফুট উঁচু এই সেতুটার নয়টা আর্চের ফাঁকা দিয়ে নাকি নয় রকমের আকাশ দেখা যায় – তাই সিংহলিজরা একে নাইন স্কাই ব্রিজ বলেও ডাকে। এই ব্রিজের সাথে একটা টানেলও আছে, ট্রেনটা যখন টানেলের ভেতর থেকে গর্জন ছাড়তে ছাড়তে রাজকীয় ভঙ্গিতে ব্রিজের ওপর এসে পড়ে তখন দেখার মত এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। প্রথমে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে ব্রিজটার সৌন্দর্য দেখলাম এরপর ঢাল বেয়ে নেমে আসলাম ব্রিজের কাছে। অনেকেই বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলছে। আমি কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ট্রেনের অপেক্ষায় ব্রিজের পাশে বসে থাকলাম। এই ব্রিজে যাওয়ার রাস্তাটা কিন্তু খুব সহজ ছিল না। পাকা রাস্তা দিয়ে অনেকটা হেঁটে, নিচে নেমে যেতে হয়, মানুষজনের বাড়ি-ঘরের মধ্যে দিয়ে। এমন একটা বাসার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় একটা বছর দশেকের মায়াকাড়া মেয়ে ডাক দিল শরবত খাওয়ার। যেহেতু অনেকেই ব্রিজটা দেখতে আসে, আর ব্রিজে যাওয়ার পথে বাড়িগুলোর চৌকাঠ মাড়াতেই হবে তাই ওরা একটা সুন্দর ব্যবসার বুদ্ধি বের করেছে। শ্রীলঙ্কায় রোদের খুব তাপ, আমার খুবই তেষ্টা পেয়েছিল। তাই সরবতের অর্ডার দিয়ে টুকটাক ইংরেজিতে মেয়েটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। মেয়েটা স্কুলে যায়, ডিসেম্বরের ছুটিতে মায়ের ব্যবসায়ে সাহায্য করছে। আমাদের মতই একেবারে টিপিকাল গ্রামের মেয়ে, কিন্তু খুবই ভদ্র আর মার্জিত, পুরো ব্যাপারটাই খুব দারুণ লাগল।

সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই, বাসাতে ফিরে একটা ঘুম দিলাম। সেই ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড ঝড়ের শব্দে। টিমটিমে আলোতে বারান্দায় এসে বৃষ্টি দেখতে লাগলাম আর অনিলকে জিজ্ঞেস করলাম যে ওর বাসাতে খাওয়া যাবে নাকি, ও সানন্দেই রাজি হয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পরেই, অনিল আমার কাছে তার দুঃখের কথা বলল। এত টাকা বাড়ির পেছনে বিনিয়োগ করছে কিন্তু লোকজন ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। কোনও বুকিং সাইটেও রেজিস্টার করতে চাইছে না কারণ ওরা কমিশন নিয়ে যায়। ওর কথা শোনার সাথে সাথেই আমি একটা ওয়েবসাইট বানানোর কাজে লেগে গেলাম। পাশের রুমের এক আমেরিকান মেয়ে এমিলিকে বললাম যে আমাকে ভাল দেখে কিছু ছবি তুলে দাও, ও বলল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর, আলো ফুটলেই করে দিবো। আরেক ঘরে এক ব্রিটিশ দম্পতি ছিল, তাদেরকে দিয়ে টেক্সটের কপি ঠিক করে নিলাম। এভাবেই দাঁড়িয়ে গেল ইডিল হোমস্টের একটা নিজস্ব পরিচয়। পরেরদিন সকালে নাস্তা খেতে খেতে এমিলিয়ার দেওয়া ছবি বসাতে লাগলাম। অনিল শুধু একটু পর পর আমার ল্যাপটপের পর্দায় উঁকি দেয় আর ওয়েবসাইটে বিভিন্ন নতুন জিনিস দেখে হাসে। গাছ থেকে একটা বিশাল আকৃতির ডাব পেড়ে খাইয়েও দিল।  এর মাঝখানে সকালে আবার হেঁটে এসেছিলাম আস পাশ থেকে। অনেক লঙ্কানই বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে সাকিব-তামিমের নাম শুনিয়ে দিল।  এভাবেই আমার কলম্বোর ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল। অনিল তার মটর সাইকেল দিয়ে আমাকে স্টেশনের কাছে নামিয়ে দিয়ে গেল একটা শর্টকাট পথ ধরে। যাওয়ার আগে যখন ও বুকে জড়িয়ে আমাকে ধরে ধন্যবাদ দিল, আমিও ওকে সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। মাত্র দুই দিনের পরিচয়, একে অন্যের ভাষাও ঠিকমত বুঝি না, এসেছিলাম সামান্য এক অতিথি হয়ে, শরীরের কিছু ঘাম আর গন্ধ এল্লাতে রেখে বিদায় নিলাম, আর সাথে নিয়ে গেলাম অবর্ণনীয় প্রকৃতির মোহাবিষ্ট স্মৃতি আর কিছু নিখাদ মানুষের অকৃত্রিম আলিঙ্গন।

শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে কিছু মজার তথ্যঃ

> শ্রীলঙ্কার বাণিজ্যিক রাজধানী কলম্বোর নাম আমরা সবাই জানলেও প্রশাসনিক রাজধানীর নাম হয়তো অনেকেই জানি না – ‘শ্রী জয়াওয়ারদানেপুরা কট্টে’।

> প্রথমে পর্তুগীজ, তার পর ওলন্দাজ আর সবশেষে ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কা শাসন করে।

> ১৯৭২ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার নাম ছিল সিলন।

> লঙ্কান্দের জাতীয় ভাষা হল সিনহলে আর তামিল।

> শ্রীলঙ্কার ৭০ শতাংশ মানুষই বৌদ্ধ, ১২ শতাংশ হিন্দু, ৯ শতাংশ মুসিলিম আর ৭ শতাংশ খ্রিস্টান। শ্রীলঙ্কার পতাকার দিকে ভাল মত লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন যে এই সব ধর্মের প্রতিফলন সেখানে পড়েছে। চার কোনায় চারটা ছোট ছোট সোনালী পাতা সোনালি রঙের সিংহটাকে ঘিরে আছে – এই পাতা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। পাশেই আছে সবুজ আর কমলা রঙের ডোরাকাটা দাগ যেগুলো যথাক্রমে ইসলাম আর হিন্দু ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করছে।

> পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী শ্রীলঙ্কার – শ্রীমাভ বন্দরনায়েক।

> শ্রীলঙ্কায় প্রায় ২০,০০০ হাতি আছে।

> শ্রীলঙ্কানরা বেশিরভাগ খাবারেই নারিকেল দেয়।

> শ্রীলঙ্কান, বিশেষ করে সিংহলিজদের নাম অনেক বড় হয়। উদাহরণ খুঁজতে বেশী দুরে যেতে হবে না। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত বোলার চামিন্দা ভাসের পুরো নাম উচ্চারণ করতে গেলে গোটা দুয়েক দাঁত পরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই নেই – ‘অয়ারনাকুলাসুরিয়া পাতাবেন্দিগে উসান্থা জোসেফ চামিন্দা ভাস’!

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT