সীমানা ছাড়াতে চাই

What is your dream destination?

সীমানা ছাড়াতে চাই

মানুষের চেয়ে শক্তিশালী প্রাণী অনেক আছে। বাঘের সামনে খালি হাতে যাওয়া তো দূরের কথা, অনেকগুলো পিঁপড়ার মাঝেও মানুষ অনেক অসহায়। মানুষের খেতে হয় তিনবেলা, ঘুমাতে হয় নিয়মিত, একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। তিলে তিলে গড়া কত সাধনার ফসল একটা সামান্য মশার কামড়েও শেষ হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এই মানুষেরই কী অসাধারণ মানসিক শক্তি, কী অসামান্য সাহস। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই মানুষই বরফ ঢাকা, পাতলা হয়ে আসা অক্সিজেনের পরোয়া না করে, হিমালয়ের ওপরে উঠে যাচ্ছে। মহামান্য এডমুণ্ড হিলারি আর তেনজিং নরগে যখন ১৯৫৩ সালে হিমালয়ের চূড়ায় ওঠার অসাধ্য সাধন করলেন, তখনতো এখনকার মত বিমানে করে লুক্লা যাওয়ার ব্যবস্থাও ছিল না। শুধু হিমালয়ের কাছাকাছি যাওয়ার জন্যই নাকি তাদেরকে অবর্ণনীয় কষ্ট সইতে হয়েছিল, কাঠমান্ডু থেকে কোন রাস্তাও ছিল না, হেঁটে হেঁটেই অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল হিমালয়ের পাদদেশে যেতে।

কিন্তু এত বিপদের আশঙ্কার মাঝেও মানুষ এত শারীরিক কষ্ট কেন করে?

আমার মনে হয়, এর কারণ, মানুষ তার সীমানা ছাড়াতে পছন্দ করে, প্রতিনিয়ত! ঘরের আর দশটা আসবাবপত্রের মত নিরুদ্বিগ্ন, নিস্তরঙ্গ, আর ঘটনাবিহীন জীবন কাটিয়ে দেওয়া, অনেকেরই খুব বেশীদিন ভাল লাগে না। তাই সে তার গতানুগতিক জীবনের বাইরে কিছু করতে চায়, তার দৈনন্দিন জীবনের বাইরে, দৈনন্দিন কাজের বাইরে, দৈনন্দিন অভ্যাসের বাইরে।

একবার ঘুরতে গিয়েছিলাম নেপালে – এমন সব দৃশ্য চারদিকে, আমার মত সমতল ভূমিতে বেড়ে ওঠা ছেলের জন্য যা প্রতিনিয়ত বিস্ময়ের ধাক্কা হয়ে আসছিল। যতই আগে ছবিতে পাহাড় দেখি না কেন, চোখের সামনে এত বড় বড় পাহাড় দেখতে পারার শিহরণ অবর্ণনীয়। পোখারার রাস্তায় হাঁটছি একদিন, এমন সময় দেখলাম, ওখানে প্যারাগ্লাইডিং করা যায়। পাহাড়ের ওপর থেকে, আপনাকে সামনে নিয়ে একজন লাফ দেবে গ্লাইডিং প্যারাসুট নিয়ে, আকাশে ভাসতে থাকবেন আপনি কোন ইঞ্জিনের সাহায্য ছাড়াই, বাতাসের ওপর ভর করে। খুব ইচ্ছে হল যে আমিও করি, কিন্তু ভিতু মন আমাকে ভয় দেখাতে থাকল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার ভেতর থেকে অন্য আরেকজন গুটি গুটি পায়ে ঠিকই হাজির হয়ে গেল আর আমাকে নিয়ে গেল প্যারাগ্লাইডিং শুরু করার জায়গায়, একটা পাহাড়ের চূড়ায়। যখন আমার ট্যান্ডেম (যিনি আমার পিঠে আমার সাথে থাকবেন), আমাকে ‘বেঁধে-ছেঁদে’ তৈরি করে ফেললেন, তখন বুঝতে পারলাম যে একটু পরেই বিশাল বড় এক পাহাড়ের ওপর থেকে লাফ দিতে যাচ্ছি। আশে পাশের সবাই একে একে লাফ দিতে লাগলো আর আমি শুকনা মুখে সেই দৃশ্য দেখতে লাগলাম। আমাকে যখন জিজ্ঞেস করল যে আমি তৈরি কিনা তখন আমি মুখ দিয়ে ঘোঁত করে একটু শব্দ করলাম আর সাথে সাথে আমার সঙ্গী দৌড় দেয়া শুরু করলো, আমিও হাঁচরে পাঁচরে তার সাথে। কিছুক্ষণ পরেই আমি আবিষ্কার করলাম যে আমার পায়ের নিচে আর মাটি নেই, আমি অনেক ওপরে হাওয়ায় ভাসছি। ভয়ে ভয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘুরে গেল! চারদিকে দেখছি আর মনে মনে একটু পরপরই বলে উঠছি “কী সুন্দর! কী সুন্দর!!” এমন সময় হঠাৎ করে মনে হল, আমি এখানে কি করছি, আমার তো এখানে থাকার কথা না! আমার তো মাটির ওপর বিছানা পেতে শুয়ে থাকার কথা। যাইহোক, বেশ কিচ্ছুক্ষণ এদিক সেদিক ওড়াউড়ির পর একটু সাহস সঞ্চয় করে আমার সঙ্গীকে বললাম যে, ভাই অনেক তো হল, চারদিকের সবই তো প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছি, এবার নামলে হয় না? আমার ট্যান্ডেম, গম্ভীর মুখে বলল, তুমি আধা ঘণ্টা ওড়ার জন্য টাকা দিয়েছ, এখন মাত্র পনের মিনিট হয়েছে, আরও পনের মিনিট উড়তে হবে! আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম! মনোযোগ অন্য দিকে নেওয়ার জন্য বাসায় বাজার করা আছে কিনা, বাংলাদেশের জাতীয় ফল কি, পৃথিবীতে কয়টা মহাদেশ আছে এগুলো মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম। এতে অবশ্য খুব বেশি সময় কাটল না  বড় জোর এক মিনিট। এর পর লোকটার সাথে টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করলাম, জানতে পারলাম যে আমিই প্রথম বাংলাদেশি, যাকে সাথে নিয়ে সে উড়ছে।  এভাবে আরও মিনিট দুয়েক কাটল, আমি ততক্ষণে নিচে নামার জন্য কাতর। আবার সে কথা বলাতে, তিনি বললেন, যে তোমাকে কিছু মজার মুহূর্ত উপহার দেই। এই বলেই তিনি আমাকে আকাশে পাক খাওয়ানো শুরু করলেন, খুব তাড়াতাড়ি এদিক সেদিক ঘুরতে লাগলাম আমরা, আর আমার পেটের ভেতরও মোচড় কাটা শুরু হল। নিচের অপরূপ সুন্দর লেক আর চারদিকের পাহাড় ঝাপসা হয়ে উঠতে লাগল মুহুর্মুহু। আমি বুঝতে পারলাম, যে তাকে আর কিছু বলে লাভ নাই, তিনি নিজের আনন্দ আমাকেও ভাগ করে দেওয়ার মহান ব্রত হাতে নিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর যখন পোখারা’র হোটেলে খাওয়া তেল দেওয়া আলু-পুরী ভদ্রলোকের মুখের ওপর ছেড়ে দিলাম তার ঠিক দু’মিনিট পর মাটিতে নিজের পায়ের অস্তিত্ব টের পেলাম। আমিই যে তার পিঠে প্রথম আর শেষ বাংলাদেশি তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই!

আকাশে তো ওড়া হল, এবার শখ চাপল, পানির নিচে যাওয়ার! ভাবনা মতই কাজ, চলে গেলাম, মালায়শিয়া – থাইল্যান্ড বর্ডারের অপরূপ সুন্দর এক দ্বীপে – পারহেনসিয়ান দ্বীপ। সুইম-স্যুট, পিঠে সিলিন্ডার আর কোমরে বিশাল ওজন চাপিয়ে যখন ডাইভ দেওয়ার জায়গার দিকে যাওয়া শুরু করলাম, তখন মনে হচ্ছিল যে উল্টিয়ে না যাই। আমার শরীরের ওজনের তুলনায় কাঁধে ঝোলান জিনিসের ওজন যে অনেক বেশি বেশি মনে হচ্ছিল।

পানির ওপরে থাকতে থাকতে, পানির নিচে কি করতে হবে আর কি করা যাবে না, এই নিয়ে অনেক পড়াশুনা করে গেলেও, পানির নিচে ডুব দেওয়ার সাথে সাথেই মাথার ভেতর পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। পানির ওপরের মূল্যবান ‘শিক্ষা’ পানির নিচে গিয়ে আর কিছুই মনে করতে পারলাম না। আগেই জানতাম যে, পানির নিচে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিঃশ্বাস নেয়া যায় না, মুখে পাইপ লাগিয়ে পিঠে ঝুলানো সিলিন্ডারই আমার ভরসা। কিন্তু এর বাস্তবিক প্রয়োগ যখন নিজের ওপর হল, তখন বুঝলাম যে একটু বিপদে আছি। মুখের পাইপটাই ভরসা – এটা যদি ছুটে যায়, তাহলে একটু না – বেশ ভালই বিপদে পড়ে যাব। যতই শরীরে সুন্দর ট্রাক স্যুট আর পায়ে লেজ লাগিয়ে রাখি, আমি তো আর মাছ না, আমি হচ্ছি মানুষ! ডাঙ্গায় তোলা মাছের ছটফট করার দৃশ্য মনে পড়ে গেল, কতবার জীবন্ত মাছ মাটির ওপরে দেখে মায়া লেগেছে। এখন নিশ্চয়ই আশে পাশের রঙ্গিন মাছগুলোও আমাকে “আহারে! বেচারা, পানিতে নামা মানুষ” – বলে দুঃখ করতে করতে চলে যাচ্ছে। চারদিকের স্বপ্নিল জগত দেখতে দেখতে আর পানির নিচে খাবি খেয়ে খেয়ে শ্বাস নিতে নিতে যখন গলাটা শুকিয়ে কাঠ, ঠিক তখনই মনে হলো, নেপালের প্যরাগ্লাইডিং করার অভিজ্ঞতা। আহারে ওটা কতই না ভাল ছিল, কতই না নিশ্চিন্তের ছিল। আকাশে খারাপ কিছু হলে তো ইমারর্জেন্সি প্যারাস্যুট ছিল, বড়জোর কয়েকটা হাড্ডি ভাঙ্গত। নিঃশ্বাস নেওয়ার তো কোনো সমস্যা ছিল না, এখন পানির নিচে কি বিপদে পড়লাম, যদি মুখের পাইপটা খুলে যায়, পানির দশ মিটার নিচে!

কত মানুষ তরতর করে হিমালয়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে, আর আমি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়েই উঠতে পারলাম না, এই লজ্জায় একসময় মরে যেতে ইচ্ছে করল। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বের করে ফেললাম যে মরে যাওয়ার চেয়ে একবার পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করে দেখাটাই সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। যদিও কাগজে কলমে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, ‘কেওকারাডং’ , আসলে সবচাইতে উঁচু হল ‘সাকা হাফং’। আর ‘তাজিনডং’ ও এর খুব কাছাকাছি। এগুলো নিয়ে যখন চিন্তা করছিলাম, তখনই খেয়াল করলাম যে মে দিবসের বন্ধের সাথে উইকএন্ড পড়েছে, তখনই মনে হল, যে এটাই সুযোগ! কিন্তু বাধ সাধল, গ্রীষ্মের তালপাকা গরম। যাকেই বলি ট্রেকিং এ যাওয়ার কথা, সেই যেন কেমন কেমন করে তাকায়! মে মাসে তখন নিয়মিত ৩৫ – ৩৮ ডিগ্রি গরম পড়ছে, চারদিক শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু, মাথায় পোকা ঢুকেছে, হয় পোকা বাঁচবে না হয় আমি! আগে ওখানে কয়েকবার যাওয়া সাকিবকে ফোন করে একটা গাইড ঠিক করে দেওয়ার অনুরোধ করলাম। আমি আবার ঘুরতে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা ছোট করে করতে পারি না। ওকে বললাম যে হাতে সময় আছে ৩ দিন – ৪ রাত, এই সময়ে ‘তাজিনডং’ আর ‘সাকা হাফং’ – এই দুইটাতে উঠতে চাই। সাকিব তো এই গরমে আমাদেরকে কিছুতেই যেতে দেবে না, আর আমি নাছোড়বান্দা। তার না যেতে দেওয়ার সব যুক্তিই আমার ডান কান দিয়ে ঢুকে বাম কান দিয়ে বের হয়ে গেলো! অবশেষে ও হাল ছেড়ে দিয়ে, একটা গাইড ঠিক করে দিল আর গাইডকে সব বুঝিয়ে বলল। সারাদিন অফিস করে রাতের বাসে রওনা দিলাম, সকালে ঘুম ভেঙ্গে যখন ভাবলাম বাইরে ‘চট্টগ্রাম’ লেখা দেখব, সেখানে দেখি ‘কুমিল্লা’। অবশেষে বান্দরবান হয়ে যখন থানচি পৌঁছলাম তখন বিকেল। সন্ধ্যায় শুরু হল ট্রেকিং, সারারাতের আধোঘুম শরীর নিয়েই। এভাবে চলতে লাগলো আমাদের হাঁটা, ভোর পেরিয়ে সকাল, সকাল পেরিয়ে দুপুর আর দুপুর পেরিয়ে রাত। শুধু বিরামহীন হাঁটা আর হাঁটা। ক্লান্ত হয়ে একটু থামলেই আমাদের গাইড বাঁশী মংয়ের হুঙ্কার। দেরি হয়ে যাচ্ছে! সাকিব ভাই বলেছে, তিন দিনে শেষ করতে হবে। ওই মুহূর্তগুলোতে বুঝতে পারলাম যে সাকিব কতটা জনপ্রিয়, আর বাঁশীর কাছে সাকিব ভাইয়ের নির্দেশ অমান্য করাটা ফৌজদারি অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ। সাকিব ভাইকে দিয়ে ফোন করিয়ে যে নির্দেশ পরিবর্তন করব, সেই উপায়ও নেই। আমরা ততক্ষণে ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে। খোলা আকাশের নিচের তাপমাত্রা ৩৭/৩৮ – অবশ্য কেউ এটা আমাকে বললে আমি বিশ্বাস করতাম না, ওটা আমার কাছে তখন ৫০/৫২ এর কাছাকাছি। একটু পরপর শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে, ঝিরির পানি দিয়ে গা ভিজিয়ে নিচ্ছি নিয়মিত, আবার সেই পানিও শুকিয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। শরীর এতটাই গরম হয়ে যাচ্ছে, যে জ্বর আসছে কিনা সেই বিভ্রমেও পড়ছি মাঝে মাঝে, কিন্তু সেদিকে তোয়াক্কা করার সময় নাই, সামনে আগাতে হবে যে! পায়ে যে কতগুলো ফোস্কা পড়ল আর তার ভেতর কয়টা গলে গেল সে শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানেন। এদিকে পিঠের ব্যাগের ওজনও প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে, সেইসাথে বাড়ছে আমার স্যান্ডেল এর ওজন, আমার পায়ের ওজন, আমার শরীরের ওজন। এক জায়গায়, ব্যাগ এর ভেতর থেকে একটা ঘেমে যাওয়া গেঞ্জি ফেলে দিলাম, মনে সান্ত্বনা, একটু ওজন মনে হয় কমল, সামনে এগোনো হয়ত আরেকটু সহজ হবে। এক একটা পাহাড়ের উচ্চতা খুব বেশি না হলেও, একটু পরপরই ওপরে উঠতে হয় অনেকটা, আবার নেমেও যেতে হয় অনেকটা। এর মাঝে একদিন বিকেলে আকাশে মেঘ করে আসলো, একটু পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব অন্ধকার আর ঝুম বৃষ্টি। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দু হাত দূরের জিনিস ও দেখা যায় না। মুহূর্তের ভেতর সারা শরীর আর ব্যাগ পানিতে ভিজে একাকার। একটা টিমটিমে টর্চ লাইট দিয়ে চারজন পথ চলছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই সরসর করে চলে গেল একটা সাপ। কান ফাটানো আওয়াজে একটু পরপরই সব সাদা হয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ঝলকে। এই সমস্যাগুলো সবই একটু পর গৌণ মনে হল, যখন দেখলাম যে আমাদেরকে ওপরে উঠতে হবে একেবারে নব্বই ডিগ্রি খাড়া হয়ে যাওয়া একটা পথ দিয়ে। আর বৃষ্টিতে, কাদা হয়ে সেই ওঠার পথ হয়ে গেছে অসম্ভব পিচ্ছিল। সেই দুর্গম এলাকার রাতে যে কিভাবে খাদে না পড়ে সবাই মিলে ওপরে উঠলাম সেটা ভাবতেই এখনও শিউরে উঠি। অবশেষে যখন ‘তাজিনডং’ আর ‘সাকা হাফং’ জয়(!) করে (জানি পাহাড় জয় করা যায় না, তাও বললাম) প্রায় ফিরে আসছি, আর মাত্র ঘণ্টা চারেক বাকি, প্রতিটা পদক্ষেপই যখন স্লো-মোশন সিনেমার কোনও দৃশ্য, তখন বারবারই মনে হচ্ছিলো যে এ যাত্রায় বেঁচে ফিরতে পারলে আর জীবনেও কোনওদিন কোথাও বের হব না। ঘরে ফ্যানের নিচে আরাম করে লুঙ্গি পরে বসে মুরগির মাংস আর মাছ ভাজা দিয়ে গরম ভাত – সাথে একটু ডাল, এটুকু পেলেই আমার মানবজীবন সার্থক!

এরপর ভুটানে, তাকসাং মনেস্ট্রি(টাইগার’স নেস্ট) তে, শ্রীলঙ্কার এল্লাতে, অথবা স্পেনের মন্ট সেনিতে কয়েকটা ডে হাইক ছাড়া সেরকম কোথাও অভিযানে আর বের হইনি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে মাথার ভেতরের সেই পোকাটা আবার খুব জ্বালাচ্ছে। দুই সপ্তাহের অন্নপূর্ণা স্যানচুয়ারি ট্রেকের কথা অনেকদিন ধরেই মাথায় ছিল, অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্প পর্যন্ত যেয়ে আবার ফিরে আসা, কিন্তু এবারের মত এত মনযোগ দিয়ে আগে কখনো দেখিনি। অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্প ৪১৩০ মিটারে, এত ওপরে নাকি বাতাসে অক্সিজেন কমে যায়, বাতাস হয়ে যায় পাতলা, মানুষ নাকি ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারে না। আর সেখানে পৌঁছে ফিরে আসতে নাকি টানা নয়-দশদিন হাঁটতে হয়। তাপমাত্রা নাকি শূন্যেরও নিচে নেমে যায়। অক্সিজেনের অভাবে শরীর আর মন নাকি অদ্ভুত আচরণ শুরু করে।

কেমন হবে সেই অনুভূতিগুলো? কেমন হবে একা একা, পিঠে ব্যাগ নিয়ে দশ দিন হাঁটার অভিজ্ঞতা? ওই দিনগুলোতে কতবার কান ধরব? আর কোনওদিন বাইরে বের না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করব? একটু বাসার ডাল- ভাত আর নিজের বিছানার জন্য মন কতবার হুহু করে কেঁদে উঠবে? এই সবকিছুই মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর পোকাটা ডেকে যাচ্ছে ভীষণভাবে – অবিরত – কবে যে মাথার পোকাটাকে বের করতে পারব!

Fuad Omar

Fuad Omar

2 Comments

  • Shaer Ahmed

    Read some of your writings, very detailed, inspiring and humorous! I myself haven’t been to many places and comparatively easy to access places. Your writings are really encouraging and make one cherish to live the life to fullest. Hope I’ll one day be able to travel around the world too 🙂 Best wishes for you and keep writing!

    ps. Very neat and well designed website 🙂

    March 5, 2017 at 12:38 am
LEAVE A COMMENT