স্বপ্নিল ক্রাবি

What is your dream destination?

স্বপ্নিল ক্রাবি

থাইল্যান্ডে বেড়াতে যাব শুনলেই সবার ঠোঁটের কোনার হাসিটা চোখ এড়ায়নি, সাথে বউ যাবে শুনলে সেটাই আবার হাহাকারে পরিণত হতেও সময় লাগেনি। থাইল্যান্ড নাকি শুধুই অবিবাহিতদের জন্য! সেই সুযোগ যখন হারিয়েছি আরও বছর আটেক আগেই তাই কিছুটা মন খারাপ করে হলেও থাইল্যান্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করে দিলাম।

থাইল্যান্ডে কোথায় যাব এই নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করতে গিয়ে কিছুটা ধারনা করতে পারলাম যে কেন বছরে প্রায় তিন কোটি মানুষ ওখানে ঘুরতে যায়। এটা আরও কিছুটা ভালোমত উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম দেশটাতে গিয়ে। দেশটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যতা তো রয়েছেই, সাথে সাথে চমৎকার অবকাঠামো আর বন্ধু বাৎসল লোকজন – সবকিছুই হাত ধরাধরি করে পর্যটন শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট ছাড়ার কথা সকাল ৮:৪৫ এ, মাত্র আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবে ব্যাংকক। ওরা আবার আমাদের চেয়ে এক ঘণ্টা এগিয়ে আছে, সুতরাং ওখানকার সময় ১:১৫ তে পৌঁছে যাবার কথা। আমাদের বিমান থাইল্যান্ডের প্রধান বিমানবন্দর সুবর্ণভূমিতে নামবে। ওখান থেকে আমরা ক্রাবি যাব। ব্যাংকক থেকে ক্রাবি প্রায় আটশ কিলোমিটার দক্ষিণে। ক্রাবি যাওয়ার বিমানটা ছাড়বে অন্য একটা বিমানবন্দর থেকে – নাম ডন মুয়াং। সাধারণত কম দামি বিমানগুলো সব ডন মুয়াং থেকেই ছাড়ে। দুইটা বিমানবন্দরের ভেতর দূরত্ব প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, ব্যাগ সংগ্রহের সময় সব কিছু মিলিয়ে দুই ঘণ্টা লাগবে বলে ধরে নিয়ছিলাম। সেই সময়টা হাতে রেখে ৩:০০ টার ব্যাংকক-ক্রাবি উড়ালে টিকিট কেটে ফেলার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। শেষ মুহূর্তে কি মনে করে রাত ৭:১৫ টার ফ্লাইটের টিকিট কাটলাম। পরে বুঝতে পেরেছিলাম এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যে কী বাঁচাই না বেঁচেছি!

ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশন পার হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম, আর মাত্র এক ঘণ্টা পরেই ফ্লাইট, ৮:৩০ এ, একটু অপেক্ষা করে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে ভিরমি খেলাম। যেই বিমান ৮:৩০ তে ছাড়ার কথা সেটা ৯:৩০ এ ছাড়বে বলে দেখাচ্ছে, কোনও ধরনের দেরির চিহ্নও দেওয়া নেই। যাই হোক, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, এমনিতেই কোনও ধরনের অপেক্ষাই আমি সহ্য করতে পারিনা, বিমানের জন্য অপেক্ষা তো না-ই! যাইহোক বিভিন্নভাবে সময় নষ্ট করে বোর্ডিং গেট এর জন্য অপেক্ষা করছি, হঠাৎ দেখি, ৯:৩০, ১০:৩০ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন সেটা ১১:৩০ টা হল তখন আর চমকালাম না, অধিক শোকে পাথর হওয়ার মত অবস্থা। এদিকে সকালের নাস্তা করে আসিনি, পেট ক্ষিদাতে চোঁ চোঁ করছে। হঠাৎ অপেক্ষমান যাত্রীদের ভেতর নড়াচড়া দেখতে পেলাম, সবাই দেখি এক লোকের পেছন পেছন যাওয়া শুরু করল। কিন্তু ঘড়িতে তো বাজে মাত্র ১০:০০ টা!  কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম, দেরি দেখে, বিমানের লোকজনের একটু দয়া হয়েছে, তাই কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছে আমাদের জন্য। যাক, সময় কাটানোর আর পেটকে ঠাণ্ডা করার কিছু সুযোগ তো পেলাম!

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিমান ছাড়ল ১২:৩০ টায়। নির্বিঘ্ন যাত্রা শেষে সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে নামলাম। বোর্ডিং গেট থেকে ইমিগ্রেশন বেশ অনেকটা দূরে। বিমানবন্দরটা এক নজর দেখেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার এই পর্যন্ত বিশটার বেশি বিমানবন্দরে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, এটি যেকোনো পশ্চিমা বিমানবন্দরের সাথে তুলনীয়। ইমিগ্রেশনের লাইন দেখে তো আমাদের মাথায় হাত! বিশাল লম্বা লাইন। আবার পরের বিমান অন্য বিমানবন্দর থেকে ছাড়তেও খুব বেশী দেরি নেই। ঠিক এমন সময় শ্যামদেশের আতিথেয়তার প্রথম নিদর্শন পেলাম। আমাদের সাথে কিছু বাচ্চা ছিল, এইটা দেখে এক পুলিশ এসে আমাদেরকে অন্য একটা লাইনের সামনে নিয়ে গেল। খুব অল্প সময়েই ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলাম।

বিমান থেকে দেখা ব্যাংকক
ইমিগ্রেশন পার হয়েই মোবাইল সিমের জন্য ছুটলাম। আগে থেকেই ইন্টারনেট থেকে ডি-ট্যাকের হ্যাপি টুরিস্ট সিম কিনে রেখেছিলাম। বিমানবন্দরেই ওদের কালেকশন পয়েন্ট আছে, ওখান থেকেই সংগ্রহ করে নিলাম। এখন যেতে হবে ডন মুয়াং বিমানবন্দরে, ক্রাবির বিমান ধরার জন্য।
আগে থেকে খোঁজ নিয়ে জেনে রেখেছিলাম যে, প্রতি ঘণ্টায় এই দুটি বিমানবন্দরের মধ্যে বাস সার্ভিস আছে, ডন মুয়াংয়ের বিমানের টিকেট দেখালেই বিনা পয়সায় চড়া যায়। সামান্য একটু খুঁজেই পেয়ে গেলাম, একটা গেটের ঠিক বাইরেই। আমরা ছাড়া মনে হয় এইটার খোঁজ আর কেউ জানে না! শুধু এক বৃদ্ধা আমাদের সঙ্গী হলেন। শুরু হল থাইল্যান্ডের বুকে আমাদের প্রথম যাত্রা।

 

সুবর্ণভূমি থেকে ডন মুয়াংয়ের বিনা পয়সার বাসের সময়সূচী – সূত্র

 

ডন মুয়াংয়ে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে গেলাম, এটাও কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কম ভাড়ার বিমানগুলো যেমন থাই লায়ন, এয়ার এশিয়া, নক এয়ার এখান থেকে ছাড়ে। সুন্দর ছিমছাম বিমানবন্দর। ঝকঝকে এয়ারবাসে করে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাত ৯:০০ টায় ক্রাবি বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। সেখানে আমাদের জন্য হোটেল এর মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছিল, আও নাংয়ে আমাদের হোটেলে পৌঁছতে আরও ৪০ মিনিট। রাত ১০:৩০ টায় আশেপাশে কোনও খাবার দোকান খোলা নেই। হোটেল থেকে দেওয়া তরমুজ খেয়েই তাই শুয়ে পড়লাম। আমি ফলজাতীয় জিনিস খুব বেশী পছন্দ করি না। কিন্তু এত মিষ্টি তরমুজ আমি আগে কখনো খাই নি!

প্রথম দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা টুকটুকে করে আও নাং সৈকতের কাছে চলে এলাম। টুকটুকে যেতে যেতেই দূরে ক্রাবির বিখ্যাত বড় বড় পাথর সদৃশ পাহাড় দেখতে পেলাম। রাস্তার পাশেই সৈকত আর ধার ঘেঁসে অনেক হোটেল। আমরা কিছুক্ষণ ওখানে বসে সমুদ্রের গর্জন শুনলাম আর সকালের নাস্তাটা সেরে নিলাম।

ঠিক ওখানেই লং টেইল বোটের টিকিট বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য। আমরা রাইলে সৈকতের টিকিট কেটে চড়ে বসলাম লং টেইল বোটে। এই নৌকায় করে রাইলে সৈকতে যাওয়ার ভ্রমণ পথটা খুব সুন্দর। দূরে দ্বীপ আর সবুজ পাহাড়, সাথে নীল পানি তো আছেই। নৌকায় করে যাওয়ার সময় উঁচু নিচু দলানিও যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। মিনিট বিশেক পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম সেখানে।

রাইলে সৈকতে এসে একটা গাছের নিচে হাত পা ছড়িয়ে বসলাম। আপনারা গেলে সাথে একটা চাদর বা মাদুর নিতে ভুলবেন না, এতে বালির হাত থেকে যেমন রক্ষা পাবেন, তেমনি পরিবারের লোকজনদেরও একটু মানসিক প্রশান্তি আসবে। একটু থিতু হয়ে, চারদিকে তাকানোর ফুরসৎ হতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল – লাইমস্টোনের ক্রাস্ট, সুগার হোয়াইট বালি আর কী সুন্দর নীল-সবুজ পানি! সাথে সমুদ্রের গর্জন। তার হাতছানি আর কতক্ষণ উপেক্ষা করা যায়? কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে তাই সমুদ্রের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। পুরো ভ্রমণে সমুদ্রে গোসল করার জন্য এইটাই সবচেয়ে ভালো জায়গা ছিল – স্বচ্ছ পানি, অল্প ভিড় আর একেবারে পরিমিত ঢেউ।

সবুজ পানিতে কায়াকিংয়ে ব্যস্ত দুই তরুণী

চারদিকেই একটা ছুটির আমেজ। নানা বর্ণের, নানা দেশের পর্যটক – কেউবা শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে, কেউবা গল্প করছে, কেউ বা চড়া রোঁদে শরীর পুড়িয়ে নিচ্ছে আবার কেউবা কায়াকিংয়ে ব্যস্ত। কেউ আবার কিছুই করছে না, একদম চুপচাপ বসে আছে। আমরা দ্বীপটা ঘুরতে বেড়িয়ে পড়লাম।

বালির উপর শুয়েই ঘণ্টা পার

রাইলে সৈকতকে দুটো অংশে ভাগ করা যায়, রাইলে ইস্ট আর ওয়েস্ট। দ্বীপের এক পাশ থেকে হেঁটে অন্য পাশে যাওয়া যায়। প্রায় তিন চার কিলোমিটার হাঁটলেই হয়। এখানে একটাই সমস্যা, খাবার-দাবারের প্রচণ্ড দাম। আও নাং থেকে অন্তত দ্বিগুণ, সে পানিই হোক বা জুস।

আমরা যে টেইল বোটে করে এসেছিলাম সেটার শেষটা সন্ধ্যে ছয়টায় রাইলে থেকে ছেড়ে যায়। তাই, ছয়টা বাজার কিছুক্ষণ আগে নৌকা ছাড়ার জায়গায় এসে পড়লাম। আও নাংয়ে ফিরতে ফিরতে সেদিনকার মত ঘোরার শক্তি মোটামুটি শেষ। খুঁজতে লেগে গেলাম খাবারের দোকান। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আর দাম দেখতে দেখতে এগুতে লাগলাম, সমুদ্র সৈকত থেকে যত দূরে যেতে লাগলাম ততই মনে হল দাম একটু করে কমছে। প্রধান সড়ক ছেড়ে গলির ভেতরে একটা দোকান খুঁজে বের করলাম। তারপর মেন্যুতে যা কিছু ছিল প্রায় তার সবই অর্ডার করে ফেললাম। ক্রাবিতে অনেক মুসলমান আছে, আমার ধারণা মালায়শিয়ার অনেক কাছে হওয়ার জন্য এটা হতে পারে। আর মুসলমান থাকার কারণে বেশিরভাগ হোটেলেই হালাল খাবার পাওয়া যায়। তাই,  ভ্রমণে যারা হালাল খাবারের জন্য চিন্তায় থাকেন তাদেরকে এখানে একটুও পরিশ্রম করতে হবে না। যাই হোক, পেট পুরে খেয়ে আমাদের হোটেলে এসে গা এলিয়ে দিলাম নরম বিছানায়, আমাদের প্রথম দিনের সমাপ্তি।

দ্বিতীয় দিন

দ্বিতীয় দিনে ভেবেছিলাম যে দূরে কোথাও যাবো, কোহ লান্টা অথবা ফি ফি দ্বীপের কথা মাথায় ছিল। কিন্তু বের হতে হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, আও নাংয়ে পৌঁছে বুঝতে পারলাম যে সব দূরের ফেরিই চলে গিয়েছে। তাই পরিকল্পনার কিছু পরিবর্তন ঘটাতে হল, আসে পাশেই কোথাও যাবো বলে ঠিক করলাম।

আও নাং থেকে ডে ট্রিপের জন্য বেশ জনপ্রিয় হল “ফোর আইল্যান্ড ট্রিপ”। “ফোর আইল্যান্ড” আসলে খুব কাছাকাছি থাকা চারটা দ্বীপ – পোডা, চিকেন, মুড় আর টাব। আমরা একটু চিন্তা করে একটা দ্বীপেই যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। আবার সেই আগেরদিনের জায়গা থেকে টিকেট কেটে চড়ে বসলাম টেইল বোটে, এবারের গন্তব্য পোডা দ্বীপ।

পোডা দ্বীপ থেকে তোলা ছবি, যেদিকেই টাকাই, এরকম সুন্দর দৃশ্য, কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখব?

 

একটু পর পর সমুদ্রের পানি এসে পুরো শরীর ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে

পোডা দ্বীপের সামনের দিকে বেশ ভিড় ছিল, আর ঢেউও বেশ কম। ছুটির দিন হওয়াতে একটা গ্রুপ রান্না খাবার-দাবার নিয়ে পিকনিক করতে এসেছিল। আমই যথারীতি অভ্যাস মত হাঁটতে লাগলাম। অনেকটা দূর হেঁটে এসে ফাঁকা এক জায়গায় এসে হাজির হলাম, একদম কেউই নেই! সৈকতের উপর শুধু বেশ কিছু গাছ ভেঙ্গে পড়ে আছে। পাশেই  এত স্বচ্ছ পানি আর সুন্দর বালি এতদিন শুধু ছবি আর সিনেমাতেই দেখেছি। সাথে আবার জঙ্গল আর আর ফাঁকে ফাঁকেই বড় বড় পাথর। গা এলিয়ে, পানিতে শরীর ডুবিয়ে চারদিকের স্বপ্নের মত দৃশ্য দেখতে দেখতেই কখন যে সময়টা কেটে গেল তা টেরই পাইনি।

আও নাং – কিং কং এর কথা ম্ঞে পড়ছে না?

আজকে আগের দিনের মত ভুল করিনি, কিছু শুকনা খাবার দাবার আর পানি আগে থেকেই কিনে নিয়ে এসেছিলাম। সেটা দিয়েই দুপুরের খাবার সারলাম। বিকেল চারটার দিকে পোডা দ্বীপ থেকে যাওয়ার শেষ সময় ছিল। পোডা দ্বীপকে বিদায় দিয়ে আও নাং সৈকতে এসে খুঁটি গেড়ে বসলাম। এটা যদি না করতাম তাহলে আসলে পরে আফসোস করতে হত। আও নাং এর সূর্যাস্তের দৃশ্যের কোনো তুলনাই হয়না। সূর্য যখন ডুবি ডুবি করছে তখন যেন চারদিকে আগুন ধরে গেল, সাথে দূরের ভৌতিক পাথরগুলো দেখে মনে হল কিং কং এর সেই স্কাল দ্বীপে এসে পড়েছি!

ছবিটা কিন্তু একটুও এডিট করিনি, আও নাং বিচ থেকে তোলা, বিশ্বাস হয়?

রাত নেমে এলে, পরের দিন কিভাবে ফি ফি দ্বীপে যাওয়া যায় এর খোঁজে বেড়িয়ে পড়লাম। যেটা বুঝলাম সেটা হল, একটা পাবলিক ফেরি সকাল ১০ টা নাগাদ ক্রাবি থেকে ছেড়ে যায়, আবার সেই দিনেই ক্রাবিতে ফিরে আসে। টিকিটের দাম নির্দিষ্ট করা কিন্তু ট্যুর এজেন্সিগুলো বিভিন্ন দামে বিক্রি করে। একটু ঘোরাঘুরি করলে গায়ে লেখা দামের চেয়েও কম দামে পাওয়া সম্ভব। সব ঠিক ঠাক করে হোটেলে চলে আসলাম। পরদিন সকাল আট টায় গাড়ি আমাদের নিতে আসবে।

তৃতীয় দিন

শরীর ‘ট্যান’ করাতেই অনেকের মনোযোগ

আও নাং শহর থেকে, আও নাং ফেরি পিয়ার বেশ কিছুটা দূরে। যাদের কাছ থেকে টিকিট কেটেছিলাম তারাই হোটেল থেকে আমাদেরকে গাড়িতে তুলে নিল।

আও নাং ফেরি পিয়ারটা ছিমছাম, পরিষ্কার, পরিচ্ছন্য। নির্দিষ্ট সময়েই জাহাজ ছাড়ল। জাহাজের নিচে বসার জন্য আসন আছে, আর উপরে খোলা ছাদ। সেখানেই অনেকে বসে অথবা শুয়ে রোদ পোহাতে শুরু করল – বেশিরভাগই সাদা চামড়ার পর্যটক। তবে মে মাসের প্রচণ্ড গরমে আমার সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। যাত্রাপথের শুরুটা কিছুটা আমাদের সুন্দরবনের মত। সময় গড়ানোর সাথে সাথে চারপাশ পরিবর্তন হতে লাগল। চারদিকের অসাধারণ দৃশ্যের হাতছানিতে গা পুড়িয়ে, গলা শুকিয়ে বসে থাকলাম, শুধু দু চোখ ভোরে দেখার জন্য। ঘণ্টা সাড়ে তিন জাহাজ ভ্রমণের পর এসে পৌঁছালাম ফি ফি তে।

এরকম নয়নাভিরাম অনেক রিসোর্টই সুনামিতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল

২০০০ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পরিচালক ড্যানি বয়েলের দি বিচ সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পরই সারা পৃথিবীর মানুষ এই ফি ফি দ্বীপের কথা জানতে পারে। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও অভিনীত এই সিনেমাটি দেখার পর পর্যটকরা এই দ্বীপে রীতিমত হুমড়ি খেয়ে পড়ে। দ্বিতীয়বার ২০০৪ সালে এই দ্বীপটি প্রলয়ঙ্কারি সুনামির জন্য আবার সবার নজরে আসে। ওই সুনামিতে দ্বীপটির প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যায়, বেশ কিছু লোক মারাও যায়। দি ইমপসিবল সিনেমাটি দেখলে ওই স্থানের সুনামির একটা ধারণা পাবেন।

নৌকায় করে ফি ফি ‘র বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছি

ফি ফি দ্বীপ কেমন দেখতে? এক কথায় “স্বর্গীয়”! ভাষার ক্ষমতা নেই এর বর্ণনার। সৃষ্টিকর্তা দু’হাত ভরে উজাড় করে এই জায়গাটা তৈরি করেছেন মানুষের চোখ জুড়ানোর জন্য। সময় যেহেতু হাতে খুব বেশী নেই, তাই একটা নৌকা ভাড়া করে ফেললাম। একটা কথা না বললেই নয় যে, এখানে যাওয়ার আগে একটা স্নরকেলিং কিটস কিনে নিলে খুব ভালো হয়। আর মাঝির সাথে একটু খাতির জমানোটাও জরুরী। যেহেতু জায়গাটা সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই তাই তিনি যেখানে যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানেই আপনাকে যেতে হবে। আর আন্দামান সাগর মাঝে মাঝেই উত্তাল থাকে, তাই লাইফ জ্যাকেট পরে থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কিছুক্ষণ পরপর ইঞ্জিন চালিত নৌকাটা আপনাকে বিভিন্ন জায়গায় থামাবে। আপনি নেমে ঘুরতে পারেন, নৌকাতেই বসে চারদিক দেখতে পারেন আবার চাইলে সাঁতারও কাটতে পারেন। তবে একেকটা জায়গার স্বাদ একেক রকম, তাই একটু নেমে দেখাই ভালো।

 

বিখ্যাত মায়া বে, এখানেই বিচ সিনেমার শুটিং হয়েছে, এখানে নামলেই ৩০০ বাথ ট্যাক্স দিতে হয়, তাই দূর থেকে দেখেই কাজ সেরেছি 🙂

পানির নিচের অদ্ভুত বর্ণিল জগত শুধু পর্দাতেই দেখেছি। ডাইভিং যেহেতু জানিনা তাই স্নরকেলিং করব বলে ঠিক করলাম। আগে অভ্যাস নেই বলে জিনিসটা সামলাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল, একটু পর পরই মুখের ভেতর নোনতা পানি ঢুকে যাচ্ছিল। সমুদ্রে নৌকা চালাতে চালাতে, আমাদের চালক ইশারা করল এক জায়গায় নামতে। বেশ ঢেউ ছিল সেখানে, তাই ভয় ভয় লাগলেও লাইফ জ্যাকেট পরে নেমে পড়লাম। ডুব দিতেই মুখ হা হয়ে আরও কিছু পানি ঢুকে গেল – চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে হরেক রঙের মাছ আর নাম না জানা প্রাণী। কি অদ্ভুত সুন্দর! অবিশ্বাস্য আর অসাধারণ। নৌকা থেকে কিছু রুটি ছড়িয়ে দেয়াতে তাদের ভিড় আরও বাড়ল। একটাই সমস্যা, জেলি মাছ অথবা এই ধরনের কিছু প্রাণী এসে কিছুক্ষণ পরপর ছুঁয়ে দিয়ে যায়। সাথে সাথেই প্রচণ্ড জ্বলতে থাকে আর জায়গাটা ফুলে যায়। এই যন্ত্রণা সহ্য করে মাছের সাথে কিছুক্ষণ ডুবে থাকলাম স্বপ্নিল জগতে। আর হ্যাঁ! সাঁতার না জানলে এখানে ঘুরতে আসার মজা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাবে, তাই সাঁতারটা তাড়াতাড়ি শিখে ফেলুন!

ফেরার পথে সূর্যদেব আরও বেশী উত্তাপ নিয়ে হাজির। সাথে পানির বোতলটাই ভরসা হয়ে থাকলো।

চতুর্থ দিন

 

ফ্রা নাং সৈকত

ক্রাবিতে শেষ দিনে চলে গেলাম ফ্রা নাং সৈকতে। ট্রিপ এডভাইজরে পাঠকদের ভোটে আও নাং এলাকার দর্শনীয় জায়গার ভেতর ফ্রা নাং সৈকত আছে এক নাম্বারে, কিন্তু এই জায়গাটাই আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষ দিনে এসে আবিষ্কার করলাম যে এটা আসলে রাইলে সৈকতের ঠিক অন্য পাশে। প্রথম দিনের মতই নৌকায় করে চলে এলাম রাইলে সৈকতে, এরপর হেঁটে হেঁটে ফ্রা নাং সৈকতে। পরে অবশ্য বুঝেছি যে রাইলেতে না নামলে নৌকাটা আমাদেরকে ফ্রা নাং এই নিয়ে যেত।

এরই মাঝে এই অভিযানের সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত এসেছিল। রাইলে আর ফ্রা নাং সৈকতের মাঝামাঝি জায়গায় ভিউ পয়েন্ট আর লেগুন আছে এরকম একটা চিহ্ন মানচিত্রে দেখতে পেলাম। ওটাতে যাওয়ার জায়গার কাছাকাছি যেয়ে দেখলাম একদম আক্ষরিক অর্থেই খাড়া পাহাড় আর কিছু দড়ি ঝুলছে। নিচে দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগলাম যে উপরে ওঠা ঠিক হবে কিনা। ক্লান্ত – বিধ্বস্ত যারা উপর থেকে নামছে তাদেরকে মিন মিন করে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম কাহিনীটা কি এটা বোঝার জন্য! তারা সবাই চোখ মটকে বলল কোনও ব্যাপার না – ওঠা শুরু করে দাও। কী আছে কপালে ভেবে সত্যি সত্যিই ওঠা শুরু করে দিলাম – প্রথমেই পড়ল ভিউ পয়েন্ট, সেখান থেকে পুরো দ্বীপটাই একেবারে দেখতে পেলাম। অনেক সুন্দর।

ভিউ পয়েন্ট থেকে তোলা ছবি, দ্বীপের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে

 

নীল গেঞ্জি পরা লোকটা সবার উপরে, দ্বিতীয় লোকটা বুদ্ধি দিচ্ছে,
তৃতীয় জন পরের ধাপে কিভাবে যাওয়া যায় তার চিন্তায় মগ্ন

ভিউ পয়েন্টে আমাদের সাথে আরও অনেকেই উঠেছেন। ওখান থেকেই আরেকটা রাস্তা লেগুনে চলে গিয়েছে। সে পথ ধরে যতই সামনে এগুতে লাগলাম ততই সঙ্গী সাথীর সংখ্যা কমতে লাগল। কখনো খাড়া ৯০ ডিগ্রি ওঠা লাগল, কখনো ৯০ ডিগ্রি নামা, মাঝে মাঝে তো পুরো হতবুদ্ধি অবস্থা – সামনে কিভাবে যাব? যারা আগে ছিল তারা কিছু কিছু বুদ্ধি দিল, কিন্তু বুদ্ধিতে তো আর সব কিছুর সমাধান হয় না, সামনে তো যেতে হবে নিজেকেই!

একটা সময় ভেবেছিলাম যে আর যেতে পারবোনা, শেষ পর্যন্ত কিভাবে কিভাবে যেনও পৌঁছে গেলাম ওখানে। লেগুনে যেয়েই ঝাপ দিলাম পানিতে, যথেষ্ট নোনতা পানি। উলটো সাতার কাটতে কাটতে চারদিকের দৃশ্য দেখে চোখ ধাধিয়ে গেল। লেগুনের চারদিক ঘেরা পাহাড়ে, সেখানে সবুজ গাছ, উপরে নীল আকাশ, আর সূর্যের সোনালির সাথে রংধনু রঙের রশ্মি, মনে হচ্ছিল এ কোথায় এলাম? ছবি তুলতে না পারার আফসোসটা থাকলো, কিন্তু মনের ক্যামেরায় মুহূর্তগুলো থেকে যাবে সারা জীবন। ফেরার পথটাও কম ভোগাল না, নিচে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই হলো।

রক ক্লাইম্বিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এক শিক্ষার্থী

ফ্রা নাংয়ে বেশ কিছু গুহা আছে, কিছুটা হেঁটে আর কিছুটা সাঁতার কেটে যাওয়া যায়, জোয়ার-ভাটার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। এখানে বেশ গহীন জঙ্গলও আছে, অনেকেই দেখি গাইডের সাথে করে যাচ্ছে, মোক্ষম জায়গায় যেয়ে রক ক্লাইম্বিং করার জন্য।

কিছু আবার গুহার মতন আছে, ঠিক গুহা না, পাথর বেছানো খাড়ি। এমন একটা নির্জন জায়গায় যেয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম, সমুদ্রের হু হু গর্জন শুনতে শুনতে কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখানে সময় যেন থেমে গিয়েছিল, মনে ভর করেছিল এক অনাবিল প্রশান্তি।

পরিশিষ্ট

কয়েকটা কথা না বললেই নয়। লন্ডনেও আমাকে ভিক্ষুকেরা বিরক্ত করেছে, ক্রাবিতে কোথাও একটাও ভিক্ষুক দেখিনি। কেউ কোথাও বিরক্ত করেনি, শুধু দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাসাজ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই এসেছিল, কিন্তু আগ্রহ না দেখালে সরে গিয়েছে। বিভিন্ন দোকানে হিজরাদের কাজ করতে দেখেছি, সুন্দর সেজেগুজে বসে আছে। থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলো লিঙ্গ পরিবর্তনের অপারেশনের জন্য বিখ্যাত। এটাও এর এক কারণ হতে পারে, যদিও এটা পুরোপুরিই আমার আন্দাজ।

শহরটা যথেষ্ট পরিষ্কার আর আও নাং সৈকতের কাছেই পাবলিক টয়লেট আছে। এক মুহূর্তের জন্যও নিজেদেরকে অনিরাপদ মনে হয়নি। তবে টুকটুক চালকদের উপর আমি কিছুটা বিরক্ত ছিলাম কারণ, রাত হলেই ওরা দাম নিয়ে উলটো পালটা করত। এখানকার ফল খুবই মজার – বিশেষ করে আম আর তরমুজের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে।

সব ভালো জিনিসই এক সময় শেষ হয়ে যায়। তেমনি আমাদের ক্রাবি অভিযানও দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। চতুর্থ দিন রাতেই বিমানে চড়ে বসলাম – গন্তব্য ব্যাংকক। সাথে থাকল ক্রাবির সেই অনন্যসাধারণ মুহূর্তগুলো – সময়ের পাতা খুলে যখন পিছন ফিরে তাকাব তখন স্বপ্ন বলে ভ্রম হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

> বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডের ভিসার জন্য এই লেখাটি দেখতে পারেন

> ব্যাংকক – ক্রাবি – ব্যাংকক বিমান ভাড়া পড়েছিল ৬০ ডলারের মত, যত আগে কাটবেন ততই কমে পাবেন।

> হোটেল প্রতি রাতে ৪০ ডলারের (২ জনের এসি রুম, সুইমিং পুল সহ) মত নিয়েছিল। আগে থেকেই বুকিং দিয়ে গিয়েছিলাম।

> ৬০০ বাথে বিমানবন্দর থেকে পিকআপের জন্য মাইক্রোবাস পেয়েছিলাম – নয় জন মানুষ আর মালপত্র দিব্যি ধরে গিয়েছিল।

> ৩০০ থেকে ৪০০ বাথে দুই জনের রাতের খাওয়া রাজকীয় ভাবে হয়ে যেত। সকালের খাবারটা আগেরদিনই কিনে রাখতাম সেভেন ইলেভেন থেকে। ভালোমত সকালে খেলে দুপুরে শুকনা খাবারের বেশী কিছু খাওয়ার দরকার হয়না।

> আমি মে মাসে গিয়েছিলাম, গরম কালে, এটা অফ সিজন, ফলে ভিড় কম থাকে, আর তুলনামূলকভাবে সস্তাতে জিনিসপত্র পাওয়া যায়, কিন্তু প্রচণ্ড গরম, আমার বেশ কষ্ট হয়েছিল।

> ক্রাবি আসলে একটা বড় রাজ্য। ক্রাবি নামে আবার শহরও আছে। অনেকটা ঢাকা বিভাগ, আর ঢাকা শহরের মত। ওখানে যেয়ে কোথায় থাকব এইটা নিয়ে আমি বেশ বিভ্রান্ত ছিলাম। পরে আও নাং এ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অনেকটা আন্দাজের উপরেই। ওখানে যেয়ে সব পরিষ্কার হয়েছে, আও নাংকে আসলে একটা ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটা সমুদ্রের কাছাকাছি এক শহর। এখানে সবকিছুই পাওয়া যায় আবার এখান থেকে খুব সহজেই সব জায়গাতে যাওয়া যায়। ফলে মানুষজন সারাদিন এখানে থাকে না, বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে রাতে এসে এখানে খায় আর ঘুমায়। তবে রাইলে দ্বীপ হল অনেক বেশী সুন্দর। আও নাং থেকে নৌকায় করে রাইলেতে যেতে হয়, একটু রাত হয়ে গেলে আর যাওয়া-আসা করা যায়না। আপনার যদি কয়েকদিন এক জায়গায় খুঁটি গেড়ে অলস সময় কাটানোর ইচ্ছে থাকে আর একটু বেশী খরচ করতে আপত্তি না থাকে তাহলে রাইলে দ্বীপেও থাকতে পারেন।

> ক্রাবি’র থেকে ব্যাংককের সুকুমভিতে কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট ভালো পাওয়া যায়। দোকানে যেই রেট টাঙ্গানো থাকে তার থেকে এক পয়সাও বাড়াতে পারিনি।

Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT