বর্ণিল স্টকহোম

What is your dream destination?

বর্ণিল স্টকহোম

বারবারা হাটন তার ১৮ বছরের জন্মদিনের আগে হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি তার জন্য জন্মদিনে কী চমক অপেক্ষা করছে! জন্মদিনে তিনি তার বাবার কাছ থেকে উপহার পেলেন আস্ত একটা ইয়ট। কালের বিবর্তনে অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে সেটা এখন একটা হোটেল –  ম্যালারড্রটনিঙ্গেন (Mälardrottningen) হোটেল। সেখানেই আমাদের এবারের গন্তব্য।

এই ইয়টটি অনেক ঘটনার সাক্ষী। একসময় অনেক নামি দামি অভিনেতা, অভিনেত্রীদের পদভারে গমগম করত এই ইয়ট। বারবারা হাটন অনেক উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। স্যার আলফ্রেড হিচককের অসংখ্য ছায়াছবির বিখ্যাত নায়ক ক্যারি গ্রান্টের সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

বারবারার কাছে এই ইয়টটি কতটা প্রিয় ছিল সেটা আমি জানতে পারিনি, কিন্তু যখন এই হোটেলের কাছে পৌঁছালাম তখন কিন্তু দারুণ লাগছিল। শান্ত নদীতে নোঙ্গর করা ইয়ট, সাদা ধবধবে রাজহাঁসের মত। ভেতরে রুম বলতে জাহাজের কেবিন। বাইরে থেকে যতটা সুন্দর লাগছিল রুমের ভেতর ঢুকে কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল। একদম ছোট্ট রুম, ব্যাগটা রাখার পর আর নাড়াচাড়ার কোনও উপায় থাকলো না। টয়লেটের ভেতরে কেমন একটা সোঁদা গন্ধ। যত, যাইহোক, ইয়টের ভেতর আছি তো, এটাই সান্ত্বনা হয়ে থাকল।

fullsizeoutput_23f4
আমাদের এবারের ট্যুরের হোটেল, দেখতে সুন্দর হলেও আরামদায়ক নয়
                       ২

fullsizeoutput_2406

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের যে বিমানবন্দরে নামলাম তার নাম আরলান্ডা বিমানবন্দর, শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে।  পুরো আরলান্ডা বিমানবন্দর জুড়েই শিল্পের ছোঁয়া – হয়তোবা একটা সুন্দর ফুল, অথবা নিয়ন আলোর ছটা কিংবা বিখ্যাত সব সুইডিশদের ছবি; সবই খুব সুন্দর করে সাজানো। ইঙ্গমার বার্গম্যান থেকে শুরু করে আলফ্রেড নোবেল কেউই সেখানে বাদ নেই। বিমান থেকে নেমেই মনটা ভাল হয়ে যায়। এমন ছিমছাম আর পরিচ্ছন্য বিমানবন্দর দেখেই দেশটা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারনা পাওয়া যায়।

স্টকহোমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা গামলা স্টান (Gamla stan) বা ওল্ড টাউন। আরলান্ডা বিমানবন্দর থেকে গামলা স্টানে ট্যাক্সি ছাড়া যাওয়ার মোটামুটি দু’টা উপায় আছে। একটা হল আরলান্ডা এক্সপ্রেস ট্রেন যেটা ২০ মিনিটে পৌঁছে দেবে সেন্ট্রাল স্টেশনে। সমস্যা হল, এই ট্রেনের টিকিটের অনেক দাম। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০০ টাকা।  আসলে ট্রেনের টিকেট না, যেকোনো নরডিক দেশ, যেমন ডেনমার্ক, নরওয়ে বা সুইডেনের সবকিছুর দামই অনেক বেশী, বাংলাদেশ থেকে ঘুরতে গেলে জিনিসপত্রের দাম দেখে ছোটখাটো হার্ট এটাকের মত হয়ে যায়। ওসব জায়গায় এমন হয়েছে যে, খাবারের দোকানের মেন্যুর দাম দেখেই পেট ভরে গিয়েছে, ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে না খেয়েই বেরিয়ে গিয়েছি রেস্তোরাঁ থেকে। যাইহোক, আমি শহরে ফেরার সবচেয়ে সস্তা উপায়টাই বেছে নিলাম – ফ্লাইবাসারনা এয়ারপোর্ট কোচ(বাস) – এতে ৪০ মিনিট লাগলেও বেশ কিছু কম টাকা দিতে হল।



এই গামলা স্টানই আসলে এক সময় স্টকহোম ছিল। এখান থেকে শহরটা আস্তে আস্তে বিস্তৃত হয়। গামলা স্টান কয়েকটা দ্বীপ নিয়ে তৈরি এক শহর। একটা দ্বীপ থেকে আরেকটা দ্বীপে খুব সহজেই হেঁটে চলে যাওয়া যায় – হোটেল থেকে একটা ম্যাপ নিয়ে নিলে তো কোন কথাই নাই।

fullsizeoutput_1dc8
 
তেরশো শতাব্দীর পুরনো রংচঙে বাড়ি, কবলস্টোনের রাস্তা, রয়্যাল পালেস, গির্জা আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা লেক – সারাদিন শুধু হেঁটে আর বসেই কাটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোথা থেকে যেন কোরাসে গাওয়া গানের সুর কানে এসে বাজলো। একটু খুঁজে বুঝতে পারলাম যে, একটা গির্জার ভেতর থেকে আসছে। একটু ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলাম কোনও কিছুর রিহার্সাল হচ্ছে। পুতুলের মত ফুটফুটে একদল কিশোর-কিশোরী গান গাইছে। আমরা যেয়ে চুপচাপ একটা বেঞ্চে যেয়ে বসলাম আর তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলাম। এক পর্যায়ে দেখলাম সবাই সামনে থেকে মোম হাতে কি সুন্দর একটা লাইন করে হেঁটে হেঁটে হাতে জ্বলন্ত মোম নিয়ে ঘুরা শুরু করল। চলার পথে বিনাপয়সার জিনিসগুলোই অনেকসময় মনের মধ্যে গেঁথে যায়, এটা ছিল তেমনই এক মুহূর্ত।

১৮৮৮ সাল। ডাইনামাইট সহ আরও অনেক কিছুর আবিষ্কারক (স্যার আলফ্রেড নোবেল) একদিন আবিস্কার করলেন যে ফ্রেঞ্চ এক সংবাদপত্রে তার মৃত্যু সংবাদ ছাপা হয়েছে –  সংবাদটি হল – “মৃত্যুর সওদাগর মৃত”। আসলে তার ভাইয়ের মৃত্যুকে ভুল করে তার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেছে তারা। এই ঘটনা তাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে গেল। তিনি চিন্তা করলেন যে তার মৃত্যুর পর সবাই কি তাকে একটা খারাপ মানুষ হিসেবেই মনে রাখবে? এমন একজন মানুষ যে কিনা ডাইনামাইট আবিষ্কার করেছিল? এমন একজন মানুষ যে কিনা অন্য মানুষদের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন পরোক্ষভাবে?

সেই সংবাদটি পড়ার পড় থেকেই তিনি তার উইল পরিবর্তন করতে লেগে গেলেন।

১৮৯৫ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তার উইলে তার শেষ ইচ্ছার কথা সবাই জানতে পারে। প্রতি বছর পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি আর সাহিত্যে যারা সর্বোচ্চ অবদান রাখবেন –  তার ভাষায় “greatest benefit on mankind” – তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে তার জমানো টাকা থেকে। সেই থেকেই পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত পুরষ্কারের চল শুরু হল – নোবেল পুরস্কার।

সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উইল

 

এই সাইকেলে চড়ে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন

 

লাইনাস পাউলিং – একমাত্র ব্যক্তি যিনি এককভাবে রসায়ন আর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন
 

নোবেল সাহেবের উইলের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ – এই লাইনগুলোর জন্যই এই পুরস্কারটি এত জনপ্রিয় হতে পেরেছে

২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারের ১০০ বছর পূর্তির বছরে স্টকহোমে নোবেল জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়। এখানে গেলে পুরস্কার বিজয়ীদের নিজেদের ব্যবহার করা জিনিস, তাদের বিভিন্ন উক্তি, কাজের বর্ণনা, পরিচিতি আর অনুপ্রেরণার কথা  জানতে পারবেন।

এই জাদুঘরে রাখা আছে বিভিন্ন চেয়ার। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই চেয়ারগুলো উল্টালে দেখা যাবে কোনও না কোনও নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর স্বাক্ষর। আফসোসের ব্যাপার হল, সব স্বাক্ষরই ২০০১ এর সময়থেকে যারা জীবিত আছেন তাদের, কারণ এই উদ্যোগটি তখনই নেওয়া হয়েছিল। আমার মত কিছু বোকা লোক এটা বুঝতে না পেরে আইনস্টাইনের স্বাক্ষর খুঁজতে থাকে।

এখানে হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত ভাললাগার আবেশ কাজ করতে থাকে – এই জাদুঘরে যিনিই যাবেন, তিনিই অনুপ্রাণিত হতে বাধ্য! যেসব শিশুরা দলবেঁধে এখানে আসছে, ছুঁয়ে দেখছে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষগুলোর কীর্তি, তাদের মনেই হয়তো জন্ম নিচ্ছে আগামী দিনের নোবেল জয়ের স্বপ্ন।

নোবেল পুরস্কার চালুর ২৮ বছর পর চলচিত্র জগতের সবচেয়ে সম্মানসূচক পুরস্কার, অস্কার, দেওয়া শুরু হয়। এই দু’টি পুরস্কার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার হলেও পুরস্কার দুটিকে নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় দু’টি পুরস্কার বলা যায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র দুই জন ব্যক্তি একই সাথে নোবেল আর অস্কার পুরস্কার জেতার বিরল গৌরবের অধিকারী। বলতে পারবেন তারা কারা?

স্টকহোম আসলে একটা আর্কিপেলাগো, মানে, অনেকগুলো দ্বীপের সমষ্টি –- বাল্টিক সাগরের দ্বিতীয় বৃহত্তম আর্কিপেলাগো। প্রায় ষাট কিলোমিটার বিস্তৃত এই আর্কিপেলাগো দেখার জন্য চেপে বসলাম স্ট্রমা নামক এক কোম্পানির জাহাজে।

সে জাহাজ আমাদেরকে সমুদ্রের ভেতর ঘুরাবে।  এক গাইড বর্ণনা করতে শুরু করলেন এর ইতিহাস। তার ভাষ্যমতে স্টকহোমের আবহাওয়া নাকি “Fifty shades of Grey” এর মত – এই আলো, এই অন্ধকার। আমাদের পুরো যাত্রাটাই কুয়াশার চাদরে মোড়া ছিল। খুব পরিষ্কার ছবি না উঠলেও – পুরনো দিনের জাহাজে করে ঘোরার  অনুভূতি কিন্তু অন্যরকম ছিল। কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। হাজার হোক ভাইকিংরা তো এই পথ ধরেই যেত, হারে-রেরে করে ঝাঁপিয়ে পড়ত জাহাজগুলোর উপর – খুব বেশি আগের কথা না কিন্তু!

fullsizeoutput_23ff

৬ 
অনেক রকম দোকান দেখেছি জীবনে – কিন্তু শুধুমাত্র সাবানের দোকান দেখিনি এর আগে। একটা বড় দোকান, যেদিকেই তাকাই শুধুই সাবান আর সাবান। সব নাকি হাতে তৈরি। কোনোটা থেকে লেবুর গন্ধ বেড়োচ্ছে, কোনোটা থেকে মধুর, আবার কোনোটা থেকে ফুলের – বলে শেষ করা যাবে না। খাবারের ম ম গন্ধ না,  সাবানের ম ম গন্ধ! লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনী, কী রঙ নেই সেখানে! আর আকৃতি? বল, হার্ট, কুকুর, বিড়াল – কিছুই বাদ নেই। কিনতে চাইলে কতখানি নিতে চান এটা বলতে হবে। ওজন করে মেপে সাবান কেটে দিয়ে দিবে আপনাকে। ঢাকাতে কিন্তু এরকম একটা দোকান খোলাই যায়!

  ৭

স্কানসেন – খোলা আকাশের নিচে পৃথিবীর প্রথম জাদুঘর এবং একইসাথে চিড়িয়াখানা। জায়গাটা এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যেন দেখে মনে হয় যে ১৯’শ শতাব্দীর কোনও সুইডিশ গ্রাম বা শহর। ঠিক সেইরকম বাড়ি, ঘর, পশু, পাখি, গাছপালা, গির্জা, কুঁড়েঘর – মনে হবে যে অন্য একটা জগতে চলে এলাম! পড়ে দেখলাম যে সুইডেনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রায় ১৫০ ধরনের বাড়ি এখানে তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্য জায়গা বিভিন্য থিমে সাজানো। কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত ঘোড়া, কোথাও হয়ত শুয়ে আছে ভাল্লুক, কোথাও বা হাঁক ছাড়ছে নেকড়ে, এল্কেরও দেখা মিলল,  এর মাঝেই পানির ভেতর দিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল একটা ভোঁদড়, একটা পাখি এসে বসল তার পাশে!

fullsizeoutput_2405


আগেই বলেছি যে অনেকগুলো ছোট ছোট দ্বীপ নিয়েই স্টকহোম, তাই যেখানেই দাঁড়াবেন, সেখান থেকেই পানিদিয়ে ঘেড়া এক খণ্ড মাটির উপর বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। বাড়িগুলোর রঙ গুলোও এক এক রকমের, খুবই রঙ্গিন।

আমি গিয়েছিলাম মার্চে – শীতের সময়। অনেক সময়ই চারদিকের অসামান্য সৌন্দর্য এড়িয়ে হোটেলে ঢুকে পড়তে হয়েছে  ঠাণ্ডার কষ্টে – গরমের দেশের মানুষ আমি – শরীরে কি আর এত ঠাণ্ডা সয়? শুনেছি গ্রীষ্মের সুইডেন নাকি একেবারেই অন্যরকম। পুরোটা সময় ধরেই আলো থাকে আর সোনারঙ্গা রঙে ঝলমল করতে থাকে চারদিক।

 ইশ, একবার গরমের সময় যদি যেতে পারতাম এই বর্ণিল শহরে!

Fuad Omar

Fuad Omar

1 Comment

LEAVE A COMMENT