প্রতিবাদী কন্ঠগুলো!

What is your dream destination?

প্রতিবাদী কন্ঠগুলো!


শীতের সকালের মিষ্টি রোদ্দুরে ঘুম ভাংলো অনিকের। আড়মোরা ভেঙ্গে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেতে বসল সে। শীতকাল সবসমই তার খুব প্রিয়। পাশের ঘর থেকে সুমনের গান ভেসে আসছে।

আজি জানলার কাছে ডেকে গেছে এক পাখির মতন সকাল…”

এমন আলস্য জড়িয়ে ধরা সকালে বাসা থেকে বের হতে কারোরই ইচ্ছে করে না, কিন্তু কাজের হাত থেকে নিস্তার নেই, অগত্যা গুটি গুটি পায়ে সে পা বাড়ালো ঢাকার রাস্তায়।


কয়েকদিন আগে একটা ব্যাগ হারিয়ে ফেলেছে অনিক। কিভাবে যে হারালো এটা সে মনে করতে পারছে না, মনে হয় কোনো বাসের সিট এর উপর ফেলে এসেছে; ব্যাগের ভেতরে তার পাসপোর্ট আর পরীক্ষার সার্টিফিকেটগুলো ছিল; হাতের কাজগুলো শেষ হওয়াতে সে ভাবলো, থানায় একটা ডায়েরি করিয়ে আসা যায় আজ।

এর আগে অনিকের থানায় যাওয়ার কোন অভিজ্ঞতা হয় নি, জীবনে প্রথমবার থানায় ঢোকার অনুভুতিটা ঠিক আশাব্যঞ্জক হলো না।টেবিলে বসে ইউনিফর্ম পরা পুলিশগুলো কাজ করছে –  এইভাবে সময় কেটে যাচ্ছে থানার। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তার পালা আসল, এর মাঝে সে যা যা দেখল তা ভুলে যাওয়াই ভালো কাজ শেষে অনেকেই ডায়েরীর মধ্যে কাগজ গুজে দিচ্ছে, আর পুলিশগুলো সেগুলো নির্বিকারভাবে পকেটে পুরে রাখছে, খুবই সহজ এবং স্বাভাবিক ভংগিতে, একটুও অপরাধবোধঅথবা নুন্যতমআড়ষ্টতা নেই তাদের ব্যবহারে;

কি সমস্যা আপনার?” অনিক সম্বিত ফিরে পেল পুলিশ অফিসার এর ডাকে।
অনিক সবকিছু ব্যাখ্যা করল;
আপনারা যে কি সব করেন! এতঅসাবধান! আপনাদের জন্য আমাদের খালি খালি ঝামেলা পোহাতে হয়।”
অনিক সবকিছুই হজম করে গেল; সব ফর্মালিটি শেষ হওয়ার পর সে চেয়ার থেকে উঠে দাড়াল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বের হতে চায় সে;
এই যে!চলে যাচ্ছেন যে”, পেছন থেকে ডাক পড়ল আবার;
থানায় কি কখনো আসেননি নাকি? সব ছোটলোকে দেখি দেশ ভরে যাচ্ছে, ভদ্রতাবোধটুকুও নেই দেখি।”
অনিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, অনেকগুলো মুখ সে দেখতে পেল, সবাই এসেছে তাদের সমস্যা নিয়ে – সবগুলো মুখই বোবা;পকেটে হাত দিল সে, কিছু কাগজের স্পর্শ পাওয়ার জন্য;

থানা থেকে বের হয়ে অনিকের খুব ক্লান্ত লাগল; আজকে কোন কাজ করতে তার আর ইচ্ছে করছে না; বাসায় ফিরতে চায় সে;

ভীড় ঠেলে বাসে উঠল সে; অনেকটা পথ; সিট খালি হতেই বসে পড়ল; আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের ভেতরে সে অন্য জগতে চলে গেল; কতক্ষণঘুমিয়েছে সে ঠিক বলতে পারল না, ঘুম ভাঙলো হইচইয়ের শব্দে।
-“
ব্যাটা, তেলের দাম বাড়ছে কয় টাকা? তুই ভাড়া ৯ টাকা চাস?”
-“
স্যার, ৯ টাকা অনেকদিন ধরেই ভাড়া”, ১০ কি ১১ বছরের একটা ছেলে করুণ চোখে বলল।
-“
তুই আমারে শেখাস?তুই কয়দিন এই রুট এ হেল্পারগিরি করিস? প্রতিদিন ৮ টাকা দিয়ে যাই”
-“
স্যার, ভাড়া ৯ টাকা, আপনি জিগান সবাইরে”
-“
তোর এত্ত বড় সাহস! মুখে মুখে তর্ক করিস!!
“…………………………………………………………”
“…………………………………………………………”


আচমকা লোকটা একটা চড় দিয়ে বসলো ছেলেটার গালে।


বাসের কিছু লোকজন ছেলেটার গায়ে হাত তোলার ঘটনাকে মেনে নিতে পারে না, কিন্তু বেশীরভাগ মানুষকেই খুশী দেখা যায়; বাসের লোকজনযে নিয়মিতই ভাড়া নিয়ে অনিয়ম করে এবং কে কবে পুরো ১/২ টাকা বেশী ভাড়া দিয়েছে এই গল্প জুড়ে দেয়; অনেকেই একমত হয় যে এদের নিয়মিত মার দেওয়া উচিত; নিয়মিত টাকা মেরে খাচ্ছে; এ সব অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলেএকসময়…. অনিকের কান দিয়ে বেশী কিছু ঢোকে না, থানায় কাজ নিয়ে আসা লোকগুলোর মুখ ঝাপসা ভাবে ভেসে আসে চোখের সামনে, ভেসে আসে নিরীহ ছোট ছেলেটার সাথে হঠাৎ ‘প্রতিবাদী’ হয়ে ওঠা বাসের বীরপুরুষদের মুখ, ভেসে আসে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছাপা আরো বড় বড় মুখ সব মুখগুলো মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় আবার ঝিমুনি আসে তারহারিয়ে যায় ঘুমের রাজ্যে


(লেখাটি বছর তিনেক আগে একটি ব্লগে দিয়েছিলাম, সামান্য পরিবর্তন করে এখানে রাখলাম। বাস্তবতার সাথে মিল না খোঁজাই কাম্য, এটা নিছকই আমার কল্পনা  🙂 )
Fuad Omar

Fuad Omar

LEAVE A COMMENT